দিল্লী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের জুনের শেষে হালনাগাদ করা ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) পলিসি ২.০ অনুমোদন করেছে। এই নীতিটি ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে এবং ২০৩০ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে। চার বছরের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো ভারতের রাজধানী শহরের পরিবহন ব্যবস্থাকে আমূল বদলে ফেলা।
এই রূপান্তরের জন্য বিনিয়োগের পরিমাণ সত্যিই আকাশছোঁয়া। বৈদ্যুতিক পরিবহনে এই উত্তরণকে সমর্থন করতে দিল্লী সরকার ১৫০ বিলিয়ন রুপি (প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার) বরাদ্দের পরিকল্পনা করেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে শহরে নিবন্ধিত সমস্ত নতুন যানবাহনের ৯৫ শতাংশই যাতে ইলেকট্রিক হয়, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি এখন আর কেবল উৎসাহমূলক নয়, বরং একটি বাধ্যতামূলক পদক্ষেপে পরিণত হতে যাচ্ছে।
নতুন নীতিতে স্ক্র্যাপেজ এবং নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কঠোর সময়সূচী নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে দিল্লীতে শুধুমাত্র বিশুদ্ধ বৈদ্যুতিক তিন চাকার রিকশা নিবন্ধনের অনুমতি দেওয়া হবে। ২০২৮ সালের এপ্রিল মাস থেকে এই নিয়ম দুই চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, যার অর্থ হলো তখন থেকে কেবল ইলেকট্রিক স্কুটার এবং মোটরসাইকেল কেনা যাবে। যারা তাদের পুরনো বিএস-ফোর (BS-IV) বা তার নিচের মডেলের গাড়ি স্ক্র্যাপ করবেন, তাদের নতুন ইভি কেনার জন্য ১ লক্ষ রুপি পর্যন্ত বিশেষ ভর্তুকি প্রদান করা হবে।
ক্রেতাদের জন্য আর্থিক সুবিধার পরিধিও অনেক বাড়ানো হয়েছে। প্রথম বছরে বৈদ্যুতিক দুই চাকার এবং তিন চাকার যানের জন্য যথাক্রমে ৩০ হাজার এবং ৫০ হাজার রুপি ভর্তুকি নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে এই অঙ্ক দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে কিছুটা কমে আসবে। ৩ মিলিয়ন রুপির কম দামের বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোর জন্য ২০৩০ সালের শেষ পর্যন্ত কোনো রোড ট্যাক্স বা রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হবে না। লক্ষণীয় বিষয় হলো, স্ট্রং হাইব্রিডসহ সব ধরণের হাইব্রিড গাড়িকে এই সরকারি সুবিধার আওতা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ এবং গাড়ি নির্মাতাদের মতামতের ভিত্তিতেই হাইব্রিড প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন যে হাইব্রিড গাড়িতে ছাড় দেওয়া হলে পরিবেশবান্ধব সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক যানে উত্তরণের প্রক্রিয়া মন্থর হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা একটি বড় ঝুঁকির দিকেও ইঙ্গিত করেছেন। হরিয়ানা এবং উত্তর প্রদেশের মতো প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে জ্বালানি চালিত গাড়ির ওপর এমন কোনো কড়াকড়ি নেই, যার ফলে অনেকে পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকে গাড়ি নিবন্ধন করিয়ে দিল্লীতে ব্যবহার করার সুযোগ নিতে পারেন।
বায়ু গুণমান ব্যবস্থাপনা কমিশন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও কিছু কঠোর ব্যবস্থার কথা ভাবছে, যার মধ্যে রয়েছে শুধুমাত্র ইভি চলাচলের জন্য সংরক্ষিত এলাকা বা জোন তৈরি করা। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চার্জিং অবকাঠামোর বর্তমান অবস্থা। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত শহরে মাত্র ৪.৮ হাজার চার্জিং পয়েন্ট ছিল, অথচ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ হাজারেরও বেশি। এছাড়া ব্যাটারির যন্ত্রাংশের জন্য চীনের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং গ্যাস রিকশা চালকদের কর্মসংস্থানের সংকটও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পূর্ববর্তী ২০২০ সালের নীতিটির প্রভাবে ২০২৫ সালে ইভি ব্যবহারের হার ২.৬ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ৪.২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। কিন্তু নতুন ২.০ সংস্করণটি আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী, যা স্বেচ্ছামূলক অংশগ্রহণের চেয়ে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার ওপর জোর দিচ্ছে। এর ফলে দিল্লী এখন ক্যালিফোর্নিয়া বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বিশ্বের সেই সারিতে যোগ দিল, যারা অত্যন্ত কঠোরভাবে জ্বালানি চালিত যানবাহনের ব্যবহার কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
শহরের সাধারণ মানুষের জন্য এই পরিবর্তনের ফলে ইলেকট্রিক স্কুটার বা রিকশা কেনা সহজ হলেও চার্জিং স্টেশনের অপ্রতুলতা একটি বড় চিন্তার বিষয়। সরকার যদিও পুরো দিল্লী জুড়ে ৩০ হাজার নতুন চার্জিং পয়েন্ট স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে তার বাস্তবায়ন কতটা দ্রুত হবে তা দেখার বিষয়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল বাজারে যেখানে ইভি-র অংশগ্রহণ মাত্র ৯-১০ শতাংশ এবং দামও তুলনামূলক বেশি, সেখানে সাধারণ মানুষ কতটা স্বতস্ফূর্তভাবে এই প্রযুক্তি গ্রহণ করবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ভবিষ্যতের বায়ু দূষণ রোধে এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ শহরের মোট পরিবহনজনিত দূষণের প্রায় ৬৭ শতাংশই আসে দুই চাকার যান থেকে। এই নীতির চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সাথে যথাযথ সমন্বয়, ব্যাটারি সাপ্লাই চেইনের নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের দ্রুত অভ্যস্ত হওয়ার ওপর। অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের দীর্ঘদিনের অভ্যাস ত্যাগ করে দিল্লীবাসীর এই বৈদ্যুতিক বিপ্লবে অংশগ্রহণই হবে দূষণমুক্ত শহর গড়ার আসল চাবিকাঠি।


