মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বুলগেরিয়ার মধ্যে ভিসা-মুক্ত যাতায়াত ব্যবস্থা এখন উচ্চপর্যায়ের সরাসরি কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে এক টেলিফোন সংলাপে দেশটিকে ভিসা ওয়েভার প্রোগ্রামের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছেন। সোফিয়া এই পদক্ষেপটি দ্রুত পর্যালোচনার প্রত্যাশা করছে। এই উদ্যোগের নেপথ্যে কী কারণ রয়েছে এবং বুলগেরীয় নাগরিকরা সহজতর এস্টা পদ্ধতির মাধ্যমে আমেরিকা ভ্রমণের কতটা কাছাকাছি পৌঁছেছেন, তা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এই কূটনৈতিক তৎপরতা মূলত দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার শক্তিশালীকরণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে ন্যাটো সদস্য হিসেবে বুলগেরিয়া সোফিয়ায় মার্কিন সামরিক বিমানের ট্রানজিট এবং জ্বালানি সরবরাহের সুবিধা নিশ্চিত করছে। এটি স্পষ্ট যে, সোফিয়া তাদের মিত্র হিসেবে বর্ধিত দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে নাগরিকদের জন্য দৃশ্যমান অর্থনৈতিক ও মানবিক সুবিধা আদায় করতে চাইছে। সামরিক সহযোগিতার এই ক্ষেত্রটিকে তারা এখন কূটনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

সোফিয়া এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে সাম্প্রতিক ফোনালাপ বুলগেরিয়ার দীর্ঘদিনের ভিসা বাতিলের প্রত্যাশাকে একটি বাস্তবসম্মত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজয়ী দলের নেতা এবং বুলগেরীয় সরকারের প্রধান রুমেন রাদেভ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সরাসরি আলোচনায় দেশটিকে দ্রুত ভিসা ওয়েভার প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলেছেন। সোফিয়া কেন ঠিক এই মুহূর্তেই কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল, তা ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এর উত্তর লুকিয়ে আছে আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণে। ন্যাটোর পূর্ব প্রান্তের দেশ হিসেবে বুলগেরিয়া ওয়াশিংটনকে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে, যার মধ্যে সোফিয়া বিমানবন্দরে এক ডজনেরও বেশি মার্কিন সামরিক বিমানের ট্রানজিট এবং অবকাঠামো ব্যবহারের অনুমতি অন্তর্ভুক্ত। এই চুক্তির মেয়াদ মে মাসের শেষে শেষ হতে চলেছে এবং পেন্টাগন এটি বাড়াতে অত্যন্ত আগ্রহী। রাদেভ, যাকে একসময় বিরোধীরা মস্কোর প্রতি সহানুভূতিশীল বলে সমালোচনা করত, এখন এই ভূ-রাজনৈতিক কার্ডটি সর্বোচ্চ সুবিধায় ব্যবহার করছেন। তিনি চাইছেন এই আনুগত্যকে বুলগেরীয় নাগরিকদের জন্য বাস্তব সুবিধায় রূপান্তর করতে।
কাঙ্ক্ষিত এস্টা সিস্টেমে প্রবেশের প্রধান বাধা হলো মার্কিন আইনের কঠোর শর্ত। কোনো প্রার্থী দেশের জন্য পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভিসায় প্রত্যাখ্যানের হার ৩ শতাংশের বেশি হওয়া চলবে না। তবে সোফিয়া এই লক্ষ্যমাত্রার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থ বছরে বুলগেরীয়দের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার কমে ঐতিহাসিক ৫.১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর আগেও এই হার ১১ শতাংশের বেশি ছিল, যা একটি বিশাল অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশজুড়ে চলমান ব্যাপক তথ্য অভিযান কি বাকি ২ শতাংশের বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করবে, তা এখন দেখার বিষয়।
সময়ের চাপ অনুভূত হচ্ছে প্রতিবেশী বুখারেস্টের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটেও। প্রতিবেশী রোমানিয়া ২০২৫ সালের শুরুতে ভিসা-মুক্ত প্রবেশের অনুমোদন পেলেও, মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসন নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং অভিবাসন পরিসংখ্যানের অসংগতির কারণে সেই সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে বাতিল করে দেয়। সোফিয়ার জন্য এই ঘটনাটি একই সাথে একটি সতর্কতা এবং উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করছে। এই প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্তি ট্রান্স-আটলান্টিক ব্যবসায়িক সংযোগকে সহজতর করবে এবং মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতে চাওয়া বুলগেরীয় কোম্পানিগুলোর খরচ ও জটিলতা অনেক কমিয়ে দেবে।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বুলগেরিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে শেনজেন জোনে প্রবেশ করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে স্থল সীমানা তুলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন ভিসা এখন নাগরিকদের বৈশ্বিক চলাফেরার ক্ষেত্রে শেষ বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। ওয়াশিংটনের সাথে এই চুক্তি চূড়ান্ত করা এখন কেবল পর্যটনের বিষয় নয়, বরং পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরে দেশটির প্রকৃত সমমর্যাদা এবং সমঅধিকারের একটি শক্তিশালী নির্দেশক।
পরিশেষে, সোফিয়া এবং ওয়াশিংটনের এই কূটনৈতিক দরকষাকষি কেবল বুলগেরিয়ার জন্য নয়, বরং পুরো বলকান অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি রাদেভ তার পরিকল্পনায় সফল হন, তবে এটি হবে বুলগেরিয়ার বৈদেশিক নীতির একটি ঐতিহাসিক জয়। নাগরিকদের জন্য সহজতর ভ্রমণ সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেশটির কৌশলগত অংশীদারিত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করবে।




