২০২৬ সালের ২০ মে, বুধবার বেইজিংয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। দুই নেতার বৈঠকটি প্রথমে সীমিত পরিসরে ও পরবর্তীতে বিস্তারিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়, যার পর একটি যৌথ বিবৃতি ও সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়; এটি মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গভীরতর করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
১. অংশীদারিত্বের নতুন পর্যায়: ‘অটুট বন্ধন’
বৈঠকের পর দুই রাষ্ট্রপ্রধান একটি সমন্বিত অংশীদারিত্ব এবং কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার সংক্রান্ত যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। এই দলিলে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে যে, রাশিয়া ও চীন পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সমমর্যাদার ভিত্তিতে তাদের ‘অটুট’ সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
উভয় পক্ষই ঘোষণা করেছে যে, দেশ দুটির মধ্যবর্তী সম্পর্ক এখন আরও কার্যকর ও দ্রুত উন্নয়নের এক নতুন যুগে পদার্পণ করেছে এবং বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার এই প্রেক্ষাপটে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা প্রতিটি দেশের জন্য একটি ‘কৌশলগত দুর্গে’ পরিণত হবে।
২. গ্যাস ও জ্বালানি: চুক্তির প্যাকেজ এবং ‘পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২’
জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদী তেল ও গ্যাস সরবরাহসহ সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা পুনর্নিশ্চিত করেছেন দুই নেতা। ক্রেমলিন প্রশাসন জানিয়েছে যে, ‘পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে—এই পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনে প্রতি বছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে পক্ষদ্বয় এই প্রকল্পের আর্থিক মডেল বা উদ্বোধনের নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি এবং কেবল উল্লেখ করেছে যে প্রকল্পটির মূল রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। এর অর্থ হলো, চুক্তিটি বর্তমানে রাজনৈতিক সম্মতির পর্যায়ে রয়েছে এবং এর প্রযুক্তিগত ও আইনি খুঁটিনাটি আগামী মাসগুলোতে যাচাই-বাছাই করা হবে।
৩. ইউক্রেন ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা: ‘শান্তি প্রক্রিয়া’র ওপর জোর
ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে শি জিনপিং আবারও একটি ‘শান্তিপূর্ণ সমাধানের’ প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন এবং লড়াই বন্ধের আহ্বান জানান, যেটিকে তিনি জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন।
যৌথ বিবৃতিতে মস্কো ও বেইজিং সংকটের সমাধানে আবারও একটি ‘সমন্বিত, শান্তিপূর্ণ এবং টেকসই’ পন্থার পক্ষে অবস্থান নিলেও কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে সরাসরি সমালোচনা করেনি। এই শব্দচয়ন থেকে স্পষ্ট যে, চীন আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চাইছে, তবে বাস্তবে তারা নিষেধাজ্ঞার সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে রাশিয়ার প্রতি ব্যাপক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।
৪. মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান: উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান
পুতিন ও শি ইরানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করেন। মার্কিন সামরিক অভিযান এবং হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ হওয়ার পর তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ায় অনেক দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শি জিনপিং বলেন যে ‘আরও সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলা উচিত’ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। এ সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদার করার লক্ষ্যে উত্তেজনা কমানো, যুদ্ধ বন্ধ এবং আঞ্চলিক বিরোধের বিষয়ে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় সাধনে চারটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।
৫. সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা: ‘ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের আশা ধূলিসাৎ’
রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা ছিল এই বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। বিবৃতিতে অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান, যৌথ মহড়া এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সমন্বয়সহ দুই দেশের ‘সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে মিথস্ক্রিয়া জোরদার’ করার সংকল্প ব্যক্ত করা হয়েছে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে এই পদক্ষেপকে মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যে ফাটল ধরার সমস্ত আশার ওপর ‘শেষ পেরেক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পশ্চিমা কূটনীতিকরা আশা করেছিলেন যে ২০২৬ সালে চীন রাশিয়ার থেকে দূরত্ব বজায় রাখা শুরু করবে, তবে পুতিনের বেইজিং সফর এবং নতুন চুক্তি স্বাক্ষর এর ঠিক বিপরীত চিত্রই তুলে ধরেছে।
৬. অর্থনীতি ও সংস্কৃতি: প্রায় ৪০টি নথি এবং ‘শিক্ষা বর্ষ’
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জানানো হয়েছে যে, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষ প্রায় ৪০টি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ শক্তিশালী করা, রেল ও পরিবহন করিডোরের উন্নয়ন এবং উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার বিস্তার ঘটানো হচ্ছে।
এছাড়া পুতিন ও শি রাশিয়া এবং চীনে যৌথভাবে ‘শিক্ষা বর্ষ’ পালনের ঘোষণা দিয়েছেন, যা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিময়, যৌথ প্রোগ্রাম এবং শিক্ষা প্রকল্পগুলোকে ত্বরান্বিত করবে। এটি প্রমাণ করে যে, দুই দেশের সম্পর্ক কেবল রাজনীতি বা সামরিক খাতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং শিক্ষার মতো ‘সফট পাওয়ার’ বা নমনীয় শক্তির ক্ষেত্রেও বিস্তৃত।



