২০২৬ সালের ২৪ জুন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA) আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রের এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় এবং বিস্তারিত দৃশ্যমান আলোর ছবি উন্মোচন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ইউক্লিড স্পেস টেলিস্কোপ, যা মূলত মহাবিশ্বের রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি অনুসন্ধানের জন্য নকশা করা হয়েছিল, সেটি সাময়িকভাবে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গার উজ্জ্বল ও জনাকীর্ণ কেন্দ্রের দিকে। এই বিশেষ পর্যবেক্ষণের ফলাফল বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক প্রত্যাশাকে অনেকখানি ছাড়িয়ে গেছে এবং মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
Today, @ESA_Euclid revealed the largest, most detailed photo ever taken of our galaxy's centre in visible light 🙌 This video takes you on a journey across this region. Turn up the volume and enjoy our galactic centre 🤩
এই বিস্ময়কর ছবিটি ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ ধারণ করা হয়েছিল এবং এটি তৈরি করতে টেলিস্কোপটির মাত্র ২৬ ঘণ্টা বা প্রায় একদিনের কিছু বেশি সময় লেগেছে। এটি মূলত নয়টি পৃথক ফ্রেমের একটি মোজাইক, যার প্রতিটি ফ্রেম আকাশের এমন একটি বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত যা পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও বড় দেখায়। ইউক্লিড তার এই সংক্ষিপ্ত অভিযানে গ্যালাকটিক বালজ বা ছায়াপথের কেন্দ্রীয় স্ফীতিতে থাকা ৬০ কোটিরও বেশি নক্ষত্র, নীহারিকা এবং নক্ষত্রপুঞ্জের তথ্য নথিবদ্ধ করেছে। ছবিটির স্বচ্ছতা ও তীক্ষ্ণতা এতটাই নিখুঁত যে, নক্ষত্রের প্রচণ্ড ভিড় থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি নক্ষত্রকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই বিশাল কাজ সম্পন্ন করতে ভূপৃষ্ঠের সাধারণ মানমন্দিরগুলোর হাজার হাজার ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হতো।
ইউক্লিড টেলিস্কোপটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এল-টু (L2) ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্টে থেকে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করছে। এর উচ্চ-রেজোলিউশন সম্পন্ন দৃশ্যমান আলোর ক্যামেরা এবং বিশাল ফিল্ড অফ ভিউ একে এই ধরণের মিশনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী করে তুলেছে। তুলনামূলকভাবে বলতে গেলে, হাবল স্পেস টেলিস্কোপের ওয়াইড-ফিল্ড ক্যামেরার তুলনায় ইউক্লিডের একটি একক ফ্রেম প্রায় ২৭০ গুণ বেশি এলাকা জুড়ে ছবি তুলতে সক্ষম, অথচ এর ছবির গুণমান ও তীক্ষ্ণতা হাবলের সমপর্যায়ের। এই সক্ষমতার কারণেই এটি খুব দ্রুত বিশাল এলাকা জরিপ করতে পারে এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় বাধার কারণে অদৃশ্য থেকে যাওয়া ক্ষীণ নক্ষত্রগুলোকেও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে।
তবে এই ছবির প্রকৃত বৈজ্ঞানিক মূল্য কেবল এর নান্দনিক সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ছায়াপথের কেন্দ্রীয় অঞ্চলটি মূলত গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিং পদ্ধতির মাধ্যমে নতুন বহির্গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেট অনুসন্ধানের জন্য একটি আদর্শ গবেষণাগার। যখন একটি নক্ষত্র অন্য একটি নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করে, তখন তার মহাকর্ষীয় শক্তি একটি লেন্সের মতো কাজ করে পেছনের নক্ষত্রের আলোকে সাময়িকভাবে বিবর্ধিত করে। যদি সামনের নক্ষত্রটির কোনো নিজস্ব গ্রহ থাকে, তবে সেই গ্রহটি আলোর উজ্জ্বলতায় একটি অতিরিক্ত এবং সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটায়। ইউক্লিডের বর্তমান জরিপ এলাকায় ইতিমধ্যেই ৫১টি পরিচিত গ্রহ ব্যবস্থা শনাক্ত করা হয়েছে এবং এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতের নতুন আবিষ্কারের জন্য একটি মূল্যবান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এই পর্যবেক্ষণগুলো নাসার (NASA) আসন্ন রোমান মিশনের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, যা একইভাবে মাইক্রোলেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রহের সন্ধান করবে।
এই প্রকল্পটি একটি উজ্জ্বল উদাহরণ যে কীভাবে মহাবিশ্বের দূরতম প্রান্তগুলো অধ্যয়নের জন্য তৈরি একটি যন্ত্র আমাদের নিজস্ব ছায়াপথের গোপন রহস্যগুলোকেও উন্মোচন করতে পারে। ইউক্লিড যখন তার প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে কোটি কোটি গ্যালাক্সির মানচিত্র তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, তখন এই ধরণের লক্ষ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণগুলো এর অসাধারণ বহুমুখী প্রতিভাকেই প্রমাণ করে। প্যারিসের ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী জঁ-ফিলিপ বিউলিউ (Jean-Philippe Beaulieu) মন্তব্য করেছেন যে, গত দুই দশকে ভূপৃষ্ঠের টেলিস্কোপগুলো এই পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রায় ৩০০টি বহির্গ্রহ খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এখন মহাকাশে আমাদের কাছে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং কার্যকর একটি হাতিয়ার রয়েছে যা এই সংখ্যাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বর্তমানে এই ঐতিহাসিক ছবিটি সাধারণ মানুষের দেখার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্র যে কতটা সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যময় এবং বিস্ময়ে ভরপুর তা আবারও মনে করিয়ে দেয়। কোটি কোটি নক্ষত্রের এই বিশাল ভিড়ের মধ্যে হয়তো হাজার হাজার অজানা জগত এবং গ্রহ লুকিয়ে আছে যা এখনো আমাদের দৃষ্টির আড়ালে। ইউক্লিড স্পেস টেলিস্কোপ কেবল সেই রহস্যময় জগতগুলোকে খুঁজে বের করার এবং আমাদের মহাজাগতিক ঠিকানাকে আরও ভালোভাবে বোঝার এক রোমাঞ্চকর যাত্রা শুরু করেছে।
