অস্তিত্বের অদৃশ্য বুনন: যেভাবে হাবল টেলিস্কোপ সঙ্ঘর্ষরত গ্যালাক্সি গুচ্ছের হৃদয়ে উঁকি দিল

লেখক: Uliana S

এই ছবিটি দুটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের মিলনের দৃশ্য দেখায়, যা মহাকর্ষণ দ্বারা টেনে আনা হচ্ছে.

আমাদের পৃথিবী থেকে প্রায় ২.২ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে মহাকাশের এক নিস্তব্ধ গভীরতায় এক অভাবনীয় মহাজাগতিক ঘটনা উন্মোচিত হচ্ছে। সেখানে দুটি বিশাল ছায়াপথ স্তবক বা গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের মধ্যে এক প্রচণ্ড সংঘর্ষ চলছে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এই বিস্ময়কর বস্তুটি সিএল০০১৬+১৬০৯ এবং এমএসিএস জে০০১৮.৫+১৬২৬ নামে পরিচিত। সম্প্রতি হাবল স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে এই সংঘর্ষের একটি অত্যন্ত বিস্তারিত ছবি ধারণ করা হয়েছে। তবে এই ছবিটি কেবল একটি চমৎকার দৃশ্য নয়, বরং এটি জ্যোতির্পদার্থবিদদের জন্য ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তুর রহস্য উন্মোচনের এক অপরিহার্য বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। এই ডার্ক ম্যাটারই হলো সেই অদৃশ্য ভিত্তি যার ওপর আমাদের সমগ্র মহাবিশ্ব দাঁড়িয়ে আছে।

কল্পনা করুন কোটি কোটি নক্ষত্র ও গ্রহ নিয়ে গঠিত দুটি বিশাল মেগাসিটি বা মহানগরী মহাকর্ষ বলের অমোঘ টানে একে অপরের দিকে ধীরগতিতে কিন্তু নিশ্চিতভাবে এগিয়ে আসছে। এক্স-রে রশ্মির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করলে এই প্রক্রিয়াটি বিশেষভাবে চমকপ্রদ দেখায়। সংঘর্ষের ফলে প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠা গ্যাস থেকে শক্তিশালী বিকিরণ নির্গত হয়। তবে আমরা যা দেখতে পাই তা মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় হিমশৈলের চূড়ামাত্র। এই মহাজাগতিক নাটকের প্রধান ভূমিকা পালন করছে ডার্ক ম্যাটার। এটি এমন এক রহস্যময় পদার্থ যা আলো নির্গত বা শোষণ করে না, কিন্তু এর প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র পুরো মহাকাশের অবয়ব নির্ধারণ করে দেয়।

যদিও বর্তমানের কোনো যন্ত্র সরাসরি ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করতে সক্ষম নয়, তবে হাবল টেলিস্কোপের তথ্য বিজ্ঞানীদের এর উপস্থিতি স্পষ্টভাবে অনুভব করতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়ার নাম গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং। ক্লাস্টারের বিশাল অদৃশ্য ভর তার পেছনের আরও দূরের গ্যালাক্সি থেকে আসা আলোকে বাঁকিয়ে দেয় এবং উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে ছবিতে বিশেষ ধরনের বাঁকানো রেখা বা বিকৃতি দেখা যায়। ছবির কেন্দ্রে উজ্জ্বল উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সিগুলোর আধিপত্য থাকলেও, তাদের পাশে সরু উজ্জ্বল উলম্ব রেখাগুলো আসলে সেই দূরবর্তী বস্তুগুলোরই প্রতিচ্ছবি যা মহাকর্ষের টানে প্রসারিত হয়েছে। হাবলের এসিএস এবং ডব্লিউএফসি৩ ক্যামেরার নিখুঁত ব্যবহারের মাধ্যমে গবেষকরা এই ক্লাস্টারের ভেতরে ডার্ক ম্যাটারের বিন্যাস মানচিত্র অত্যন্ত নির্ভুলভাবে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলোর এই মিলন প্রক্রিয়া মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামো গঠনের একটি মৌলিক ভিত্তি। এই ধরনের ঘটনাগুলো কোটি কোটি বছর ধরে চলতে থাকে, যা বিজ্ঞানীদের গ্যালাক্সির বিবর্তন এবং সাধারণ পদার্থের সাথে ডার্ক ম্যাটারের মিথস্ক্রিয়া অধ্যয়নের এক অনন্য সুযোগ করে দেয়। সিএল০০১৬+১৬০৯ এর ক্ষেত্রে এক্স-রে থেকে শুরু করে দৃশ্যমান এবং ইনফ্রারেড আলো পর্যন্ত বিস্তৃত বহুমুখী পর্যবেক্ষণ একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরেছে। এখান থেকে এটি স্পষ্ট যে, উত্তপ্ত গ্যাস এবং ডার্ক ম্যাটারের আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডার্ক ম্যাটার এখানে এক ধরনের মহাজাগতিক কাঠামো হিসেবে কাজ করে যা সবকিছুর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।

এই গুরুত্বপূর্ণ ছবিটি রিলিক্স প্রোগ্রামের মতো একটি বিশাল গবেষণা উদ্যোগের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল মহাবিশ্বের আদিম সময়ের লেন্সযুক্ত গ্যালাক্সিগুলো খুঁজে বের করা। কক্ষপথে ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সফলভাবে কাজ করার পরেও হাবল টেলিস্কোপ এখনও সর্বোচ্চ মানের তথ্য সরবরাহ করে যাচ্ছে। এই তথ্যগুলো কেবল বর্তমান সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি নতুন প্রজন্মের আধুনিক মানমন্দিরগুলোর কাজকেও দারুণভাবে পরিপূরক হিসেবে সাহায্য করছে। এর ফলে আমাদের মহাজাগতিক জ্ঞানের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

মহাকাশের গভীর থেকে আসা প্রতিটি নতুন ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এই মহাবিশ্ব কতটা গতিশীল এবং রহস্যে ঘেরা। প্রথম দর্শনে যা একটি স্থির মুহূর্ত বলে মনে হয়, তা আসলে কোটি কোটি বছর ধরে চলা এক উত্তাল মহাজাগতিক প্রক্রিয়া। হাবলের মতো শক্তিশালী যন্ত্রের কল্যাণে মানবজাতি ধাপে ধাপে এই মহিমান্বিত গ্যালাকটিক ড্যান্স বা ছায়াপথের নৃত্যের রহস্য উন্মোচন করছে। এর মাধ্যমেই আমরা ধীরে ধীরে আমাদের এই মহাবিশ্বের বিকাশ ও অস্তিত্বের মৌলিক নিয়মগুলো বোঝার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছি।

34 দৃশ্য

এই বিষয়ে আরও নিবন্ধ পড়ুন:

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।