স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের দুর্গম এলাকা ও দ্বীপগুলোতে স্বেচ্ছাসেবীরা বিরল সব বীজের সন্ধানে কাজ করছেন—যেগুলো শেষ তুষারযুগের সুপ্রাচীন জিনগত স্মৃতির ধারক। হাতে সংগ্রহ করা এই বীজগুলো কেবল রোপণ সামগ্রী নয়, বরং এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশেষ অভিযোজন ক্ষমতা যা এককালে দেশটির বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত প্রাচীন বনভূমি পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করবে।
২০২৩ সালে শুরু হওয়া ‘ট্রিজ ফর লাইফ’ (Trees for Life) এবং ‘উডল্যান্ড ট্রাস্ট স্কটল্যান্ড’-এর (Woodland Trust Scotland) বীজ সংগ্রহ প্রকল্প ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ১০ লাখ থাকলেও তিন বছরে স্বেচ্ছাসেবীরা বিরল ও দুর্গম এলাকার প্রজাতির ১ কোটি ১০ লাখেরও (১১ মিলিয়ন) বেশি বীজ সংগ্রহ করেছেন। বাণিজ্যিক নার্সারিগুলোর নাগালের বাইরে থাকা অত্যন্ত দুর্গম সব জায়গায় প্রায় ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবী কাজ করে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১১ গুণ বেশি সাফল্য দেখিয়েছেন। বিশাল পরিমাণের এই বীজ থেকে প্রায় ৭৮ লাখ চারাগাছ উৎপাদন করা সম্ভব। এই বীজগুলো পশ্চিম অঞ্চল এবং স্কটিশ রেইনফরেস্ট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, যেখানকার গাছগুলো বিশেষ জিনগত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, যা সেগুলোকে রোগবালাই ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী করে তোলে।
সংগৃহীত প্রজাতির মধ্যে রয়েছে হেজেল, ওক, বামন বার্চ, উইলো, জুনিপার, বুনো চেরি, উইচ এলম, ইউ এবং এল্ডার। প্রতিটি বীজ ডানড্রেগান (Dundreggan) রিওয়াইল্ডিং সেন্টারে পরীক্ষা করা হয়, যেখানে ট্রিজ ফর লাইফ-এর বিশেষায়িত নার্সারি অবস্থিত। এরপর বাছাইকৃত বীজগুলো স্কটল্যান্ড জুড়ে অনুমোদিত নার্সারিগুলোতে পাঠানো হয়। সমস্ত নার্সারিই ‘ইউকে অ্যান্ড আয়ারল্যান্ড সোর্সড অ্যান্ড গ্রোন’ (UK and Ireland Sourced and Grown) স্কিমের অন্তর্ভুক্ত, যা চারাগুলোর স্থানীয় উৎস এবং গুণমান নিশ্চিত করে। প্রকল্পের সফলতার কারণে তিন বছরের প্রাথমিক মেয়াদ শেষে এটি আরও অন্তত এক বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমানে স্কটল্যান্ড ইউরোপের অন্যতম স্বল্প বনভূমির দেশ। দেশটির মাত্র ১৮% এলাকা বনভূমি দ্বারা আচ্ছাদিত, যা ইউরোপীয় গড় ৩৭%-এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। আদি বা আদিবাসী বনাঞ্চল মাত্র ৪% জমিতে টিকে আছে এবং তার অর্ধেকেরও বেশি বনের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। হাইল্যান্ডসের ক্যালেডোনীয় বন, যা একসময় কাঠবিড়ালি, গ্রাউস ও ক্রসিবিল পাখির বিচরণক্ষেত্র ছিল, এখন তার ২%-এরও কম অবশিষ্ট আছে। পশ্চিম উপকূলে বর্তমানে মাত্র ৩০ হাজার হেক্টর বিরল নাতিশীতোষ্ণ রেইনফরেস্ট টিকে আছে, যা অত্যন্ত বিপন্ন এক বাস্তুসংস্থান। এই এলাকাগুলোতে অতি-সামুদ্রিক জলবায়ু বিদ্যমান যেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং মৃদু শীত থাকে, যা বিরল মস, লিভারওয়ার্ট এবং লাইকেনের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। স্থানীয় জিনগত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বীজ সংগ্রহ নিশ্চিত উৎসের রোপণ সামগ্রীর ঘাটতি মেটাতে এবং ভবিষ্যতে রোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিপরীতে বনের স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
ডানড্রেগান হলো এই প্রকল্পের ফ্ল্যাগশিপ সাইট। গ্লেনমরিস্টনের ৪,১০০ হেক্টরের এই রিওয়াইল্ডিং এস্টেটটি ২০০৮ সালে ট্রিজ ফর লাইফ কিনে নেয়। এখানে অবস্থিত বিশেষায়িত নার্সারি থেকে প্রতি বছর স্থানীয় বীজ থেকে প্রায় ৮০ হাজার চারাগাছ তৈরি করা হয়। এই নার্সারি বিরল প্রজাতি যেমন বামন বার্চ, পর্বত উইলো এবং অ্যাসপেন চাষে বিশেষজ্ঞ, যা স্কটল্যান্ড থেকে প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছিল। বীজ সংগ্রহ, পরীক্ষা এবং চারা তৈরির পুরো কাজটি স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর নির্ভরশীল, যারা কেবল গাছের অভাবই মেটাচ্ছেন না বরং প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের কাজে নিবেদিত মানুষের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করছেন। প্রকল্প সমন্বয়কারীরা এই উদ্যোগকে স্কটল্যান্ডের জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখছেন।
সংগৃহীত প্রতিটি বীজের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এবং সম্মিলিতভাবে এগুলো হারিয়ে যাওয়া ল্যান্ডস্কেপ বা ভূ-প্রকৃতিকে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে সক্ষম। এই আন্দোলনটি ৩০ বছর মেয়াদী বিশাল ‘অ্যাফ্রিক হাইল্যান্ডস’ (Affric Highlands) প্রকল্পের অংশ, যা স্কটিশ হাইল্যান্ডের ৫ লাখ একরেরও বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং এটি ব্রিটেনের বৃহত্তম প্রকৃতি পুনরুদ্ধার প্রকল্প হতে যাচ্ছে। এই ধরনের উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, একটি প্রাচীন বনভূমির হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার মহৎ লক্ষ্য নিয়ে দুর্গম প্রান্তরে অনেকগুলো হাতের ধৈর্যশীল ও নিরলস পরিশ্রম থেকেই বাস্তুসংস্থানের পুনরুদ্ধার শুরু হয়।

