কিউ হার্বেরিয়ামে ডারউইনের সংগৃহীত নমুনা সহ লক্ষ লক্ষ শুকনো উদ্ভিদের যে ভাণ্ডার রয়েছে, তা কেবল একটি সাধারণ সংরক্ষণাগার নয় বরং মানবজাতির সম্ভাব্য রক্ষার এক জীবন্ত মানচিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আলমারিতে ধুলো জমা হলদেটে সেই পুরোনো উদ্ভিদের পাতাগুলো এখন স্ক্যান করা হচ্ছে এবং এমন সব ডাটাবেসে আপলোড করা হচ্ছে যেখানে কম্পিউটারের মাধ্যমে যে কোনো গবেষক প্রবেশ করতে পারবেন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উদ্ভিদবিদ্যার এই সংগ্রহগুলো সাধারণের নাগালের বাইরে ছিল, যেখানে লক্ষ লক্ষ নমুনা কেবল বিশেষজ্ঞরাই দেখার সুযোগ পেতেন। তবে বর্তমানের ডিজিটালাইজেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই প্রচলিত নিয়মগুলো বদলে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলগুলো এখন সেজ এবং পিট মস-এর মতো প্রজাতি শনাক্ত করতে পারছে যাদের পার্থক্য কেবল অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচেই ধরা পড়ে এবং এর মাধ্যমে তারা বিলুপ্তপ্রায় বা অনাবিষ্কৃত উদ্ভিদগুলো দ্রুত খুঁজে বের করছে।
রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস কিউ-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল্যায়ন করা ৭০,০০০ উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই বিলুপ্তির হুমকির মুখে রয়েছে। আরও প্রায় ৩,৩০,০০০ প্রজাতির এখনো মূল্যায়ন করা হয়নি এবং বিশেষজ্ঞদের মতে প্রায় এক লক্ষ উদ্ভিদের কোনো বৈজ্ঞানিক নাম নেই। ছত্রাকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও অস্পষ্ট, কারণ সম্ভাব্য ২০ লক্ষ প্রজাতির মধ্যে মাত্র একটি অংশ বর্ণিত হয়েছে এবং পরিচিত প্রজাতিগুলোর মধ্যে এক শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে বিলুপ্তির ঝুঁকি যাচাই করা সম্ভব হয়েছে।
কিউ কর্তৃপক্ষ ডারউইনের সংগৃহীত নমুনা সহ তাদের কাছে থাকা মোট ৭৫ লক্ষ নমুনার সবকটিই ডিজিটাল রূপ দিয়েছে। এই প্রকল্পের ব্যস্ততম সময়ে দলটি প্রতিদিন ২০,০০০টি পর্যন্ত উচ্চ-রেজোলিউশনের ছবি তুলত। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১৪ কোটি ৫০ লক্ষ ডিজিটাল নমুনা সংরক্ষিত থাকলেও তা হার্বেরিয়ামে রক্ষিত মোট উপাদানের ১৬ শতাংশের চেয়েও কম।
উদ্ভিদের জীবনচক্রে যে পরিবর্তন আসছে, তা ইতিমধ্যে ডিজিটালাইজড এই সংগ্রহগুলো থেকে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ৮০ লক্ষ নমুনা বিশ্লেষণ করে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল দেখেছে যে, গত এক শতাব্দীতে উদ্ভিদের ফুল ফোটার সময় প্রতি দশকে গড়ে ২.৫ দিন করে এগিয়ে এসেছে। কোনো প্রজাতি সময়ের আগে আবার কোনোটি পরে পুষ্পিত হচ্ছে, যা ঋতুচক্রের ওপর নির্ভরশীল পরাগায়নকারী পতঙ্গ ও অন্যান্য প্রাণীদের সাথে তাদের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
বর্তমান প্রযুক্তি ব্যবহার করে ১৮০ বছর পুরোনো ছত্রাকের নমুনা থেকেও ডিএনএ সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। এই ধরনের তথ্য ওষুধের জন্য নতুন উপাদান খুঁজে পেতে এবং ছত্রাকজনিত রোগের বিস্তার সম্পর্কে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জটিল উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্তকরণের কাজ ত্বরান্বিত করছে এবং মাদাগাস্কারের মতো উচ্চ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলের তথ্যাদি সবার নাগালে পৌঁছে দিচ্ছে।
তবে প্রতিবেদনের লেখকরা ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত বিপুল শক্তি ও পানির খরচের মতো ঝুঁকির বিষয়গুলোও উল্লেখ করেছেন। ডিজিটাল প্রযুক্তি ছাড়া এই সংগ্রহের একটি বিশাল অংশ বিজ্ঞানের অগোচরেই থেকে যেত। তবে এই ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারগুলো যদি অসম্পূর্ণ থাকে, তবে তা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এই ব্যবস্থাগুলোকে সত্যিই ফলপ্রসূ করতে হলে আরও সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংরক্ষণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব এবং আর্কাইভগুলোর জন্য স্থায়ী অর্থায়ন প্রয়োজন। ডারউইনের সংগ্রহশালার ডিজিটালাইজেশন হলো একটি দীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র, যেখানে বহু পুরোনো নমুনা হয়তো এমন সব উদ্ভিদের সন্ধান দেবে যা ক্ষুধা ও রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের পথ দেখাবে।
প্রতিটি ডিজিটালাইজড উদ্ভিদের পাতা কেবল একটি ছবি নয়, বরং এমন সব প্রজাতির রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি যা হয়তো গবেষণার আগেই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে পারে।

