সামুদ্রিক শৈবাল দেখতে সাধারণ উদ্ভিদের মতো মনে হলেও বাস্তবে এরা প্রাণের একেবারেই ভিন্ন শাখার অন্তর্ভুক্ত। স্থলজ উদ্ভিদের চেয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে এদের উৎপত্তি হয়েছে এবং এরা নিজস্ব এক বিবর্তনীয় পথ পাড়ি দিয়েছে যা বিস্ময়কর সব বৈশিষ্ট্যে ভরপুর।
প্রথম পার্থক্যটি হলো এদের উৎপত্তিতে। সবুজ, বাদামী এবং লোহিত শৈবাল ইউক্যারিয়টের ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর অন্তর্গত। সবুজ শৈবাল স্থলজ উদ্ভিদের কাছাকাছি হলেও ল্যামিনারিয়ার মতো বাদামী শৈবালগুলো মূলত স্ট্র্যামেনোপাইলসের অন্তর্ভুক্ত এবং এদের পূর্বপুরুষ সম্পূর্ণ আলাদা। অন্যদিকে, লোহিত শৈবাল আরও আগে, প্রায় ১০০ কোটি বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত এদের গঠনশৈলী। শৈবালের কোনো প্রকৃত মূল, কাণ্ড বা পাতা নেই। মূলের বদলে এদের রয়েছে রাইজয়েড বা বিশেষ এক ধরণের সংলগ্ন অঙ্গ, যা কেবল পাথরের গায়ে শৈবালকে আটকে রাখে। এরা স্পঞ্জের মতো শরীরের পুরো পৃষ্ঠতল দিয়ে পানি থেকে পুষ্টি উপাদান শুষে নেয়।
তৃতীয়ত এদের বিশালতা এবং সাগরে এদের ভূমিকা। কিছু বাদামী শৈবাল পানির নিচে প্রায় ৫০ মিটার পর্যন্ত উঁচু প্রকৃত সমুদ্র-বন তৈরি করে। এই বনগুলো হাজার হাজার প্রজাতির মাছ, ক্রাস্টেসিয়ান এবং মোলাস্কের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি স্থলভাগের বনের মতোই বিপুল পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে।
চতুর্থত হলো এদের জটিল জীবনচক্র। অনেক শৈবালের জীবনচক্রে পর্যায়ক্রমিক জনু লক্ষ্য করা যায়: যেখানে একটি ধাপ ডিপ্লয়েড এবং অন্যটি হ্যাপ্লয়েড। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে স্পোর এবং গ্যামেট দেখতে এতটাই আলাদা হয় যে, কেবল জেনেটিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব যে তারা আসলে একই জীবের ভিন্ন রূপ।
পঞ্চমত দ্রুত বিবর্তিত হওয়ার ক্ষমতা। লবণাক্ততা, তাপমাত্রা এবং আলোর তীব্রতার পরিবর্তনের সাথে শৈবাল খুব সহজেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। একারণেই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা সামুদ্রিক ঝড়ের পর সমুদ্রতলের নতুন নতুন এলাকায় এরাই প্রথম বসতি স্থাপন করে এবং সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান পুনর্গঠনে সহায়তা করে।
ষষ্ঠত হলো এদের প্রাচীনত্ব এবং টিকে থাকার অদম্য ক্ষমতা। জীবাশ্ম থেকে প্রাপ্ত প্রমাণ অনুযায়ী, লোহিত শৈবাল প্রায় ১২০ কোটি বছর আগেও বিদ্যমান ছিল। এই সুদীর্ঘ সময়ে তারা বেশ কয়েকবার গণবিলুপ্তির হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে এবং আজও পৃথিবীর কার্বন ও অক্সিজেন চক্রের অপরিহার্য অংশ হয়ে টিকে আছে।
শৈবাল যে কেবল "সামুদ্রিক উদ্ভিদ" নয় বরং একটি স্বতন্ত্র এবং অতি প্রাচীন প্রাণের রূপ—এই সত্যটি অনুধাবন করা সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান এবং পৃথিবীর জলবায়ুর ভবিষ্যৎকে আরও নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে।


