নিউ ইয়র্কের ইথাকার ইস্ট লন সিমেট্রি (East Lawn Cemetery) দিয়ে হাঁটার সময় কর্নেল ইউনিভার্সিটির ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান র্যাচেল ফোর্ডাইস (Rachel Fordyce) এক অদ্ভুত দৃশ্য লক্ষ্য করেন। তিনি দেখেন যে মাটির নিচ থেকে অবিশ্বাস্য সংখ্যক মৌমাছি ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে আসছে। কৌতূহলী হয়ে তিনি কিছু নমুনা সংগ্রহ করেন এবং তার ল্যাবরেটরি সুপারভাইজার তথা এন্টোমোলজি বা পতঙ্গবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ব্রায়ান ড্যানফোর্থের (Bryan Danforth) কাছে নিয়ে যান। এই সাধারণ পর্যবেক্ষণটিই পরবর্তীতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার সূচনা করে।

গবেষকরা নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর আবিষ্কার করেন যে, এই শান্ত কবরস্থানটি আসলে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম খননকারী মৌমাছি বা মাইনিং বি-এর আবাসস্থলের ওপর অবস্থিত। এই মৌমাছিগুলো আন্ড্রেনা রেগুলারিস (Andrena regularis) প্রজাতির, যা সাধারণ খননকারী মৌমাছি হিসেবেও পরিচিত। মাটির নিচে এদের এমন বিশাল জনপদ আগে খুব কমই নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
জনসংখ্যার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানিয়েছেন যে, মাত্র ১.৫ একর (প্রায় ০.৬ হেক্টর) জমিতে গড়ে প্রায় ৫৫ লক্ষ মৌমাছি বসবাস করছে। পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যা ৩০ থেকে ৮০ লক্ষ পর্যন্ত হতে পারে। এই বিশাল মৌমাছি বাহিনীর কর্মক্ষমতা ২০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক মৌচাকের আউটপুটের সমান, যা বিজ্ঞানীদের রীতিমতো চমকে দিয়েছে।
কিন্তু কেন এই মৌমাছিরা এই নির্দিষ্ট স্থানটিকেই বেছে নিল? এর পেছনে বেশ কিছু ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইস্ট লন সিমেট্রি একটি দীর্ঘস্থায়ী কবরস্থান হওয়ায় এখানকার মাটি সাধারণত চাষাবাদ বা বড় ধরনের খননকাজের শিকার হয় না। এই নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশ মৌমাছিদের বহু প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি করে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এখানকার মাটির গঠন এদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। এখানকার মাটি আলগা, বালিযুক্ত এবং পানি নিষ্কাশনের চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। আন্ড্রেনা রেগুলারিস প্রজাতির মৌমাছিরা মাটির নিচে গভীর সুড়ঙ্গ বা গর্ত তৈরি করতে পছন্দ করে। এই কবরস্থানের মাটিতে তারা অনায়াসেই ৩০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত গর্ত খুঁড়তে পারে, যা তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ।
এছাড়া এই এলাকায় অন্যান্য কীটপতঙ্গের প্রতিযোগিতা অনেক কম এবং ক্ষতিকারক কীটনাশকের ব্যবহার নেই বললেই চলে। নিরিবিলি পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদের উপস্থিতি এই মৌমাছিদের সংখ্যাবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, এই কলোনিটি অন্তত ১০০ বছর ধরে এখানে টিকে আছে, কারণ ১৯৩৫ সালে প্রথমবার এই স্থানে এই প্রজাতির উপস্থিতি নথিবদ্ধ করা হয়েছিল।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি মৌমাছিদের কোনো সাধারণ 'সুপার-কলোনি' নয়। আন্ড্রেনা রেগুলারিস মূলত নির্জন বা একক মৌমাছি (solitary bees)। মৌমাছি বললেই আমরা যেমন একটি রানীর অধীনে হাজার হাজার শ্রমিকের কথা ভাবি, এরা তেমন নয়। এখানে প্রতিটি স্ত্রী মৌমাছি স্বাধীনভাবে নিজের গর্ত খনন করে, ডিম পাড়ে এবং সন্তানদের জন্য খাদ্যের সংস্থান করে। তারা কেবল একই স্থানে লক্ষ লক্ষ ব্যক্তিগত বাসা তৈরি করে একটি বিশাল 'গ্রাম' গড়ে তুলেছে।
এই মৌমাছিগুলো পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী, বিশেষ করে পরাগায়ণের ক্ষেত্রে। আপেল গাছ এবং অন্যান্য ফলদ ফসলের পরাগায়ণে এরা অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করে। শত শত বাণিজ্যিক মৌচাক যে পরিমাণ কাজ করতে পারে, এই মৌমাছিরা একাই সেই ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া এরা অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের; যেহেতু এদের কোনো সাধারণ মৌচাক বা মধু রক্ষার তাগিদ নেই, তাই এরা মানুষের প্রতি মোটেও আক্রমণাত্মক নয়।
দশকের পর দশক ধরে কেন এই বিশাল কর্মযজ্ঞ মানুষের নজরে আসেনি, তা একটি বড় প্রশ্ন। এর মূল কারণ হলো এদের সক্রিয়তার সময়কাল। এই মৌমাছিরা বছরে মাত্র কয়েক সপ্তাহ, মূলত এপ্রিল এবং মে মাসে মাটির উপরে সক্রিয় থাকে। বছরের বাকি সময়টা তারা মাটির নিচেই অতিবাহিত করে। কবরস্থানগুলো সাধারণত নিরিবিলি জায়গা হওয়ায় এবং মানুষ মূল পথের বাইরে খুব একটা না যাওয়ায় এই মৌসুমি দৃশ্যটি এতদিন অজানাই ছিল।
এই প্রজাতির একটি বিরল জৈবিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এরা পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গ হিসেবে মাটির নিচেই শীতকাল অতিবাহিত করে। যখন এপ্রিলের তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তখন লক্ষ লক্ষ মৌমাছি একসাথে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। প্রথমে পুরুষ মৌমাছিরা বেরিয়ে এসে কবরের ফলকগুলোর ওপর মিলন ঝাঁক (mating swarms) তৈরি করে স্ত্রী মৌমাছিদের জন্য অপেক্ষা করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঠিক তখনই ঘটে যখন আপেল গাছগুলোতে ফুল ফোটার সময় হয়।
এই আবিষ্কারটি শহুরে পরিবেশে জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের জায়গাগুলোতে কংক্রিটের আস্তরণ দেওয়া বা ল্যান্ডস্কেপ পরিবর্তন করা হলে এক ঋতুতেই লক্ষ লক্ষ গুরুত্বপূর্ণ পরাগায়ণকারী পতঙ্গ হারিয়ে যেতে পারে। এটি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রফেসর ব্রায়ান ড্যানফোর্থ কর্নেল ইউনিভার্সিটির এক বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেছেন, 'যদি আমরা এই সাইটগুলোর মূল্য বুঝতে না পারি এবং এগুলোকে রক্ষা না করি, তবে কেউ হয়তো এখানে রাস্তা বানিয়ে ফেলবে। মুহূর্তের মধ্যে আমরা ৫৫ লক্ষ বন্য পরাগায়ণকারীকে হারাবো, যাদের ওপর আমাদের আঞ্চলিক খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভরশীল।'
দীর্ঘ ৯০ বছর ধরে ৫৫ লক্ষ মৌমাছি এই কবরস্থানের নিচে নিরবে বংশবিস্তার করে চলেছে। উপরে যখন মানুষের প্রজন্ম জন্ম নিয়েছে, জীবন অতিবাহিত করেছে এবং চিরবিদায় নিয়েছে, তখন তাদের পায়ের নিচেই এক অদৃশ্য ও স্পন্দিত জগত গুঞ্জন করে চলেছে। এই ঘটনাটি প্রকৃতির সাথে আমাদের সম্পর্কের একটি চমৎকার রূপক হিসেবে কাজ করে।
আমরা প্রায়শই আমাদের চারপাশের জগতকে পুরোপুরি চিনি বলে ধরে নিই, কিন্তু প্রকৃতি এখনও অনেক রহস্য নিজের বুকে লুকিয়ে রেখেছে। এই মৌমাছিদের গল্প আমাদের শেখায় যে, আমাদের পায়ের ঠিক নিচেই হয়তো লুকিয়ে আছে কোনো বিস্ময়কর মহাবিশ্ব। তাই পরবর্তীবার যখন কোনো পুরনো কবরস্থান বা নিরিবিলি জায়গার পাশ দিয়ে যাবেন, মাটির দিকে একটু ভালো করে তাকিয়ে দেখুন।
র্যাচেল ফোর্ডাইস আজও সেই একই কবরস্থানে তার গাড়ি পার্ক করেন। তবে এখন তিনি জানেন যে, পরিচিত পথেই মাঝে মাঝে সবচেয়ে অসাধারণ আবিষ্কারগুলো অপেক্ষা করে থাকে। এর জন্য কেবল একটু নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাতে হয়। প্রকৃতির এই বিশাল ভাণ্ডার আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে, শুধু দেখার মতো চোখ থাকা প্রয়োজন।
- ইস্ট লন সিমেট্রি ইথাকার একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে স্বীকৃত।
- ৫৫ লক্ষ মৌমাছির এই উপস্থিতি বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় অনন্য।
- আন্ড্রেনা রেগুলারিস প্রজাতির সংরক্ষণ এখন বিজ্ঞানীদের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

