হলিউড তারকাদের শারীরিক গঠন কীভাবে তৈরি হয় এবং হেনরি ক্যাভিলের মতো অভিনেতারা কেন সবসময় পর্দার মতো ফিট থাকার চেষ্টা করেন না, তা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। আমরা আগেই জেনেছি কীভাবে অভিনেতারা সিনেমার চরিত্রের প্রয়োজনে না খেয়ে থাকেন, এবার আমরা জানব 'ড্রাইং আউট' বা শরীর থেকে জলীয় অংশ কমিয়ে ফেলার প্রক্রিয়াটি আসলে কী।
উদাহরণ হিসেবে হেনরি ক্যাভিলের কথা ধরা যাক। আমাদের টিম সম্প্রতি তার অভিনীত নাইটলাইফ সিনেমাটি নিয়ে পর্যালোচনা করেছে। যখনই ক্যাভিল তার স্বাভাবিক শারীরিক গঠনে ফিরে আসেন, তখন ইন্টারনেটে তাকে নিয়ে নানা মিম ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে আউট-অফ-শেপ সুপারম্যান বলা হয়।
অভিনেতার শৈশবের গল্প এই মিথটিকে আরও উসকে দেয়। ক্যাভিল নিজেই জানিয়েছেন যে স্কুলে পড়ার সময় তিনি কিছুটা স্থূল ছিলেন এবং সহপাঠীরা তাকে ফ্যাট ক্যাভিল বলে উপহাস করত। পরবর্তীতে এই কথাটিই তার ওজন বাড়ার প্রবণতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
তবে সুপারহিরো সিনেমার বাইরে অভিনেতাদের সবসময় চরম শারীরিক সংজ্ঞার প্রয়োজন হয় না। অনেক অ্যাকশন সিনেমার ক্ষেত্রে চওড়া কাঁধ, শক্তিশালী পিঠ এবং ভারী যোদ্ধার মতো শারীরিক গঠন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পোশাক পরা অবস্থায় অতিরিক্ত শুকনো শরীরের চেয়ে ঘন এবং পেশিবহুল শরীর অনেক বেশি আকর্ষণীয় দেখায়। তাই অভিনেতার শারীরিক পরিবর্তনের মানে এই নয় যে তারা ব্যায়াম করা ছেড়ে দিয়েছেন।
যদি চিত্রনাট্যে অভিনেতাকে খালি গায়ে দেখা যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে প্রস্তুতির জন্য কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। ক্যামেরার সামনে যাওয়ার আগের কয়েক দিন সবচেয়ে কঠিন হয়।
প্রথম ধাপে শরীরের চর্বির হার কমানো হয়। শুটিংয়ের কয়েক মাস আগে থেকেই অভিনেতা ক্যালরি গ্রহণ কমিয়ে দেন এবং প্রোটিন, ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন।
খাদ্যতালিকায় সাধারণত চর্বিহীন মাংস, মাছ, ডিম, শাকসবজি এবং পরিমিত কার্বোহাইড্রেট থাকে। শক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম পেশি ধরে রাখতে সাহায্য করে, আর কার্ডিও ব্যায়াম ক্যালরি পোড়াতে ভূমিকা রাখে।
দ্বিতীয় ধাপে জল ও কার্বোহাইড্রেট নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নির্দিষ্ট দৃশ্যের আগে অ্যাথলেট ও অভিনেতারা সাময়িকভাবে জল, লবণ ও কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ পরিবর্তন করেন।
প্রথমে কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে গ্লাইকোজেন ভাণ্ডার খালি করা হয়। এরপর পুনরায় কার্বোহাইড্রেট যোগ করা হয় যাতে পেশিগুলো ফুলে ওঠে। একই সময়ে জল পান সীমিত করা হয় যাতে ত্বক পেশির সাথে আরও শক্তভাবে লেগে থাকে। তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং কেবল পেশাদার তত্ত্বাবধানেই করা উচিত।
তৃতীয় ধাপে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা তৈরি করা হয়। এটিই সেই চরম সংজ্ঞার কারণ যা দর্শকরা পোস্টারে দেখেন। সাউনা, গরম স্নান এবং জল পান বন্ধ করে এটি করা হয়। এর প্রভাব ক্ষণস্থায়ী এবং এতে দুর্বলতা, মাথাব্যথা ও পেশিতে টান লাগার মতো সমস্যা হতে পারে।
চতুর্থ ধাপে পাম্পিং, মেকআপ ও আলোর কারসাজি ব্যবহার করা হয়। শুটিংয়ের আগে অভিনেতারা পুশ-আপ বা ডাম্বেল দিয়ে ব্যায়াম করেন যাতে পেশিতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। এরপর তেল বা বিশেষ মেকআপ ব্যবহার করে পেশির খাঁজ স্পষ্ট করা হয়। সঠিক আলোর ব্যবহার পেশিকে আরও বড় ও গভীর দেখায়।
পোস্টারের মতো শরীর সারা বছর ধরে রাখা সম্ভব নয়। এতে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ক্লান্তি এবং মনোযোগের অভাব দেখা দেয়। শুটিং শেষ হওয়ার পর শরীর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং ওজন বাড়ে, যা মূলত জল ও শক্তির সঞ্চয়।
স্বাস্থ্যই সবচেয়ে বড় সম্পদ। জনপ্রিয় হওয়ার সাথে সাথে অভিনেতারা তাদের প্রস্তুতির শর্ত পরিবর্তনের সুযোগ পান। যদি সিনেমায় চরম সংজ্ঞার প্রয়োজন না থাকে, তবে কষ্টকর ডিহাইড্রেশনের কোনো মানে নেই।
হেনরি ক্যাভিল, ক্রিস হেমসওয়ার্থ বা টম হার্ডির মতো অভিনেতারা শুটিংয়ের মাঝে বেশি ভারী দেখাতেই পারেন। এটি তাদের ফিটনেস হারানোর লক্ষণ নয়, বরং সুস্থ থাকার লক্ষণ। সুপারম্যানের মতো প্রতিদিন দেখা দেওয়া তাদের দায়িত্ব নয়।
মনে রাখতে হবে, পোস্টারের শরীর কোনো জীবনধারা নয়, এটি একটি সাময়িক পোশাক। এটি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চেহারার সাথে তুলনা করা অর্থহীন। ক্যাভিল নিজেকে ছেড়ে দেননি, তিনি কেবল সিনেমার চরম অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছেন।
নারীদের ক্ষেত্রেও প্রস্তুতির প্রক্রিয়াটি একই রকম, তবে শারীরবৃত্তীয় পার্থক্যের কারণে এতে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। বডি কনট্যুরিং এবং আলোর কারসাজি ব্যবহার করে তাদের শরীরকে পর্দায় নিখুঁত দেখানো হয়।
নারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ড্রাইং আউট দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে, যেমন ঋতুচক্রের সমস্যা বা ত্বকের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া। তাই সুস্থ ও স্বাভাবিক ওজনে ফিরে আসাই তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো।
পরিশেষে, পর্দায় যা দেখা যায় তা একটি চমৎকার বিভ্রম মাত্র। আসল জীবনে সুস্থ ও প্রাণবন্ত মানুষই প্রকৃত সৌন্দর্যের প্রতীক। স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু বজায় রাখাই যেকোনো অভিনেতার জন্য সবচেয়ে বড় সাফল্য।



