‘দ্য কিউরিয়াস কেস অফ বেঞ্জামিন বাটন’ কেবল একটি সিনেমাই নয়, এটি সময়ের নিষ্ঠুর পরিক্রমা, পদার্থবিদ্যার নিয়মকে হার মানানো প্রেম এবং মানব জীবনের ভঙ্গুরতার এক নান্দনিক কাব্য। ডেভিড ফিঞ্চারের এই চলচ্চিত্রটি দর্শকের মনে এক শান্ত ও নির্মল বিষণ্ণতা জাগিয়ে তোলে, তবে রূপালি পর্দায় এর আসার পথটি খোদ এর নায়কের ভাগ্যের মতোই রোমাঞ্চকর ছিল।
যেভাবে এল সিনেমার ভাবনা
মূলত ১৯২২ সালে বিখ্যাত লেখক এফ. স্কট ফিটজেরাল্ডের লেখা একটি ছোট ও ব্যঙ্গাত্মক গল্পের ওপর ভিত্তি করেই এই ছবি তৈরি হয়েছে। গল্পের দার্শনিক গভীরতা এবং দৃশ্যপট তৈরির জটিলতার কারণে দীর্ঘকাল এটিকে ‘চিত্রায়ণ অযোগ্য’ বলে মনে করা হতো, কিন্তু হলিউড দমে যায়নি।
* পরিচালকদের ঐতিহাসিক রদবদল: বিভিন্ন সময়ে বিনোদন জগতের মহীরুহরা এই প্রজেক্টটি নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। ১৯৯১ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গের এই ছবিটি পরিচালনা করার কথা ছিল এবং প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তরুণ টম ক্রুজের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে রন হাওয়ার্ড এবং স্পাইক জোনজের মতো নির্মাতারাও এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
* এক কালজয়ী সৃষ্টির জন্ম: শেষ পর্যন্ত সব নিখুঁত করার কারিগর ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালকের আসনে বসেন। চিত্রনাট্যকার এরিক রথের সাথে মিলে তিনি মূল গল্পের আমূল পরিবর্তন ঘটান। ফিটজেরাল্ডের গল্পটি মূলত সামাজিক বিদ্রূপের হলেও ফিঞ্চার একে বিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে এক বিশাল ও হৃদয়স্পর্শী মহাকাব্যে রূপান্তর করেন, যেখানে সময় কেবল একটি পটভূমি নয় বরং প্রধান প্রতিপক্ষ এবং বেঞ্জামিন ও ডেইজির ভালোবাসার একমাত্র সাক্ষী হয়ে ওঠে।
শ্যুটিং সেটের কিছু মজার ও আকর্ষণীয় তথ্য
১. মেকআপের চেয়ারে পাঁচ ঘণ্টার লড়াই
সুদর্শন ব্র্যাড পিটকে জরাজীর্ণ এক বৃদ্ধে রূপান্তর করতে প্রচণ্ড পরিশ্রমের প্রয়োজন ছিল। অস্কারজয়ী মেকআপ শিল্পী গ্রেগ ক্যানমের নিপুণ ছোঁয়ায় বার্ধক্যের জটিল মেকআপ নিতে পিটকে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা চেয়ারে বসে থাকতে হতো। অতিবাহিত (বা না কাটানো) বছরগুলোর ভার শরীরে অনুভব করার জন্য অভিনেতাকে লাঠি হাতে হাঁটা শিখতে হয়েছিল এবং নিজের শারীরিক ভঙ্গিমাতেও পরিবর্তন আনতে হয়েছিল।
২. জীবনের ক্যালেন্ডার হিসেবে ট্যাটু
যেহেতু বেঞ্জামিনের শরীর দিন দিন তরুণ হয়ে উঠছিল এবং শারীরিকভাবে সে অতিবাহিত বছরগুলো ‘ভুলে’ যাচ্ছিল, তাই ব্র্যাড পিটের চরিত্রটি শরীরে ট্যাটু করাতেন। এটি ছিল তার চামড়ায় খোদাই করা এক ব্যক্তিগত ক্যালেন্ডার, যার মাধ্যমে তিনি স্মৃতির সুতো হারিয়ে না ফেলে বিদায়ী সময়ের চিহ্ন ধরে রাখতেন।
৩. ঘড়ি যখন উল্টো চলে
সিনেমাটি শুরু হয় এক অন্ধ ঘড়ি নির্মাতার মন্ত্রমুগ্ধকর কিংবদন্তি দিয়ে, যিনি এমন এক ঘড়ি তৈরি করেছিলেন যার কাঁটা উল্টো দিকে ঘোরে। কারিগর আশা করেছিলেন, কাঁটা উল্টো দিকে চললে হয়তো প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত তার ছেলে আবার জীবনে ফিরে আসবে। সিনেমার জন্য বিশেষভাবে তৈরি এই অনন্য ঘড়িটি ছিল বাস্তবের একমাত্র সংস্করণ এবং এটি নিয়তিকে ফাঁকি দেওয়ার মানবিক আকুলতার অন্যতম এক শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল প্রতীকে পরিণত হয়।
৪. পটভূমিতে হ্যারিকেন ‘ক্যাটরিনা’র ছায়া
বিধ্বংসী হ্যারিকেন ‘ক্যাটরিনা’র তাণ্ডবের ঠিক পরেই নিউ অরলিন্সে এই ছবির শ্যুটিং হয়েছিল। পরিচালক শহরের ক্ষতগুলো পর্দার আড়ালে ঢেকে না রেখে বরং বিধ্বস্ত রাস্তাঘাটের বাস্তব বিষণ্ণতা ও শূন্যতাকে সিনেমার গল্পের সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। এটি চলচ্চিত্রটিকে এক অকৃত্রিম, প্রায় স্পর্শযোগ্য ভঙ্গুরতা এবং বিলীন হতে থাকা এক আবহ প্রদান করেছে।
৫. কেট ব্ল্যানচেটের ব্যালে সাধনা
পর্দায় ব্যালে নৃত্যশিল্পী ডেইজির লালিত্য ও একাগ্রতা ফুটিয়ে তুলতে অতুলনীয় কেট ব্ল্যানচেটকে মাসের পর মাস কঠোর প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। তাকে কেবল নাচের জটিল মুদ্রাগুলো শিখলেই চলত না, বরং ব্যালের ছন্দকে তার চরিত্রের পেশির স্মৃতিতে গেঁথে নিতে হয়েছিল, যাতে দর্শক তার প্রতিটি ভঙ্গিমায় বিশ্বাস খুঁজে পায়।
৬. ডিজিটাল প্রযুক্তিতে ‘বৃদ্ধ শিশু’
সবচেয়ে পরাবাস্তব দৃশ্যগুলো, যেখানে বেঞ্জামিনকে কুঁচকানো চামড়ার এক বৃদ্ধ শিশুর মতো দেখায়, তা সিজিআই প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। নির্মাতারা কম্পিউটার গ্রাফিক্স ও পিটের মুখভঙ্গির অ্যানিমেশনের সাথে একজন ডুপ্লিকেট অভিনেতার শরীরের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন, যা এমন এক গা ছমছমে অথচ আকর্ষণীয় রূপ তৈরি করেছিল যা আজও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়—এমনকি এই এআই (AI) এর যুগেও।
উল্লেখ্য, Gaya রেটিং — ৮.৯/১০
আর আপনি যদি এটি না দেখে থাকেন, তবে ছবিটি অবশ্যই দেখুন। ‘দ্য কিউরিয়াস কেস অফ বেঞ্জামিন বাটন’ মূলত একটি রূপকধর্মী চলচ্চিত্র। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ঘড়ির কাঁটা সামনের দিকে চলল নাকি উল্টো দিকে, তা মোটেও বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, সময় যখন আমাদের অনন্য ও অপূরণীয় মুহূর্তগুলো গণনা করে চলেছে, তখন আমরা কার হাত ধরে আছি।



