আমরা প্রায়ই শুনি: "নতুন কিছু শুরু করার বয়স পার হয়ে গেছে"। কিন্তু আন্না মেরি রবার্টসন মোজেস ৭৮ বছর বয়সে তুলি হাতে তুলে নিয়েছিলেন — এবং গোটা বিশ্বকে জয় করেছিলেন।
আন্নার জন্ম ১৮৬০ সালে এক বিশাল কৃষক পরিবারে। শৈশব থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর প্রবল ঝোঁক ছিল। তাঁর না ছিল ক্যানভাস, না ছিল রঙ; তাই হাতের কাছে যা পেতেন তা-ই ব্যবহার করতেন: জামের রস, আঙুরের রস, চক কিংবা কয়লা। তিনি কাঠের তক্তা বা দেওয়ালপত্রের ওপর ছবি আঁকতেন। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে কঠোর গ্রামীণ জীবনে শিল্পের কোনো স্থান ছিল না। মাত্র ১২ বছর বয়সেই আন্নাকে নিজের অন্ন সংস্থানের জন্য পাশের একটি খামারে পরিচারিকার কাজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সৃজনশীলতার স্বপ্নটি অনেক দিনের জন্য আড়ালে চলে যায়।
২৭ বছর বয়সে তিনি থমাস মোজেস নামে এক কৃষককে বিয়ে করেন (তিনি মোট দশটি সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, যার মধ্যে পাঁচটি শৈশবেই মারা যায়)। আন্না একজন আদর্শ কৃষাণি হয়ে ওঠেন: সাবান তৈরি করা, মাখন তোলা এবং মাঠে কাজ করার মধ্য দিয়েই তাঁর দিন কাটত। মাঝেমধ্যে তিনি পেন্সিল হাতে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পরিবারের অসহযোগিতার মুখে পড়তেন। তাঁর স্বামী এবং আত্মীয়-স্বজনরা ছবি আঁকাকে নিছক সময়ের অপচয় ও খেয়ালিপনা বলে মনে করতেন। "চোখের সামনে যা আছে তাই আবার আঁকার দরকার কী? বরং কাজের কাজ করো", — এমনটাই শুনতে হতো তাঁকে। আর আন্নাও পরিবারের প্রতি কর্তব্যের কথা ভেবে আবার তুলি লুকিয়ে রাখতেন।
জীবনের মোড় ঘুরল তাঁর ষাটোর্ধ্ব বয়সে। ৬৭ বছর বয়সে হঠাৎ তাঁর স্বামী মারা যান। খামারের দায়িত্ব ছেলের হাতে চলে যায়, আর বড় ছেলেমেয়েরা অনেক আগেই নিজেদের সংসার নিয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। আন্না খালি বাড়িতে একা হয়ে পড়লেন। একাকীত্ব ও বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠতে তিনি পশমি সুতো দিয়ে ছবি ফুটিয়ে তুলতে শুরু করেন। কিন্তু ৭৬ বছর বয়সে তীব্র বাতের ব্যথায় তাঁর আঙুলগুলো কুঁকড়ে যায়। ফলে সুঁই ধরা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
মনে হচ্ছিল, জীবনের শেষ অবলম্বনটুকুও বোধহয় হারিয়ে গেল। কিন্তু তখন তাঁর বোন বলেছিলেন: "তুমি যদি সেলাই করতে না পারো, তবে ছবি আঁকার চেষ্টা করো"।
আন্না সস্তা তেলের রঙ আর একটি ইজেল কিনে ফেললেন। আর ঠিক তখনই এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল: একাকী বৃদ্ধার জানলা দিয়ে তিনি যা দেখতেন তা নয়, বরং সারা জীবন হৃদয়ে যা লালন করেছেন তা আঁকতে শুরু করলেন। তিনি তাঁর যৌবনের সেই "পুরানো সোনালী দিনগুলো" ফুটিয়ে তুলতেন: স্লেজ গাড়িতে ভ্রমণ, ম্যাপেল সিরাপ সংগ্রহ, গ্রামের উৎসব এবং মেলা। বাস্তব জীবনে যে উষ্ণতার অভাব ছিল, তিনি ক্যানভাসে সেই মায়াবী জগৎ তৈরি করতে শুরু করেন।
তিনি বন্ধুদের ছবি উপহার দিতেন এবং স্থানীয় ওষুধের দোকান বা মেলায় খুব সল্প মূল্যে সেগুলো বিক্রির জন্য রাখতেন। ১৯৩৮ সালে নিউ ইয়র্কের সংগ্রাহক লুইস ক্যালডর হঠাৎ এই কাজগুলো দেখেন এবং ছবিগুলোর অকৃত্রিম সারল্য দেখে মুগ্ধ হয়ে সবকটি কিনে নেন। তিনি প্রতিটি ছবি মাত্র ৫ ডলারে কিনেছিলেন। সেই সময় আন্নার কাছে এটাই অনেক বড় পাওনা ছিল, তিনি ভাবতেও পারেননি যে বছরের ব্যবধানে এই ছবিগুলোর দাম কয়েক লক্ষ ডলারে পৌঁছাবে।
এরপর ১৯৪০ সালে, যখন আন্নার বয়স ৮০ বছর, নিউ ইয়র্কের অটো কালির গ্যালারিতে তাঁর একক প্রদর্শনী শুরু হয়, যার নাম ছিল "একজন কৃষাণি কী আঁকেন"।
মন্দা আর যুদ্ধের আশঙ্কায় ক্লান্ত আমেরিকা তাঁর শিল্পকর্মে মুগ্ধ হয়ে যায়। "দাদী মোজেস"-এর ছবিগুলো আশা, প্রশান্তি আর শাশ্বত মূল্যবোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। ৯০ বছর বয়সের মধ্যে তিনি একজন মহাতারকায় পরিণত হন: হোয়াইট হাউসে তাঁর ডাক পড়ে, TIME এবং Life ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে তাঁর ছবি ছাপা হয়, তাঁর আঁকা ছবির কোটি কোটি কপি বিক্রি হয় এবং Hallmark কোম্পানি তাঁর কাজ দিয়ে ক্রিসমাস কার্ড তৈরি শুরু করে। বিখ্যাত হওয়ার পর তিনি নিজেই অবাক হতেন। তিনি বলতেন: "আমি তো শুধু চারপাশে যা দেখি তাই আঁকি, মানুষ কেন এটা নিয়ে এত মাতামাতি করে তা আমি বুঝি না"।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কাজ করে গেছেন। এমনকি ১০০ বছর বয়সেও তিনি ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে স্টুডিওতে যেতেন, কারণ অলস বসে থাকা তাঁর স্বভাবে ছিল না।
টাকার পেছনে তিনি কখনোই ছোটেননি। যখন তাঁর ছবি প্রচুর দামে বিক্রি হতে শুরু করল, তখনও তিনি খামারে অত্যন্ত সাধারণভাবে জীবনযাপন করতেন এবং বন্ধুদের ছবি উপহার দিতেন। (বন্ধুদের জন্য এটি কত বড় উপহার ছিল ভাবুন!)।
কয়েক দশক পর আজ তাঁর কাজগুলোর মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। শৈশবে আন্নার কাছে রঙ কেনার টাকা ছিল না বলে তিনি ফলের রস দিয়ে বেড়ার ওপর আঁকতেন, আর আজ বিশ্বখ্যাত নিলাম কেন্দ্রগুলোতে তাঁর মূল ছবিগুলো সংগ্রহের জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।
তাঁর "ম্যাপেল রস সংগ্রহ" (Sugaring Off) নামক চিত্রকর্মটি রেকর্ড ১.৩৬ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছে। এমনকি ছোট ছোট কাজগুলোও নিয়মিত হাজার হাজার ডলারে নিলামে বিক্রি হয়। যে মহিলাকে একসময় পরিজনরা অদ্ভুত ও সময়ের অপচয়কারী ভাবত, তিনি কেবল নিজের নামই উজ্জ্বল করেননি, বরং জীবদ্দশাতেই কোটিপতি হয়ে উঠেছিলেন।
১০১ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি ছবি এঁকেছেন এবং তাঁর এই "দেরিতে শুরু হওয়া" জীবনে প্রায় ১৫০০-এর বেশি ছবি তৈরি করেছেন। আন্না মেরি কখনোই আগে শুরু না করার জন্য আক্ষেপ করেননি, কিংবা পরিবারের ওপর কোনো ক্ষোভ রাখেননি। তাঁর জীবনদর্শন ছিল অত্যন্ত সহজ ও দৃঢ়:
"আমি আমার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে দেখি এটি ছিল একটি সুন্দর কর্মযজ্ঞ। আমি সুখী ছিলাম। জীবন ঠিক তেমনটাই হয়, যেমনটা আমরা একে তৈরি করি। সব সময় এমনই ছিল এবং এমনই থাকবে।"


