জাপানের বৃহত্তম সেকেন্ড-হ্যান্ড চেইন ‘সেকেন্ড স্ট্রিট’ দোকানের সংখ্যার দিক থেকে প্রথমবারের মতো জাতীয় ব্র্যান্ড ইউনিক্লো-কে (Uniqlo) ছাড়িয়ে গেছে: বর্তমানে তাদের শোরুম ৯৩১টি, যেখানে ইউনিক্লোর রয়েছে ৭৯৪টি। এটি কেবল কোনো পরিসংখ্যানগত কৌতূহল নয়, বরং দেশটির সাধারণ মানুষের কেনাকাটার ধরনে এক মৌলিক রূপান্তরের সংকেত।
১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করা ‘সেকেন্ড স্ট্রিট’ এক দশক আগেও মূলত জাপানের ভেতরেই পরিচিত ছিল। বর্তমানে এটি একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যার প্রসারের সুনির্দিষ্ট কৌশল রয়েছে: ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে বিশ্বজুড়ে তাদের শোরুমের সংখ্যা ১০০০-এ দাঁড়াবে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১৫০০-তে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এই চেইনটি দ্রুত বাড়ছে, যেখানে ২০২৫ সাল নাগাদ তাদের ৪৮টি শোরুম চালু হয়েছে (২০১৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে তাদের প্রথম শোরুমটি খোলা হয়েছিল)।
এই শোরুমগুলোতে সাশ্রয়ী সাধারণ পোশাক থেকে শুরু করে বিলাসবহুল ব্র্যান্ড (লুই ভিটন, শ্যানেল), জাপানিজ স্ট্রিটওয়্যারের দুর্লভ সংগ্রহ, এমনকি ভিন্টেজ স্নিকার্স ও ঘড়িও পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য যে, আয়ের দিক থেকে ইউনিক্লো এখনও বহুগুণ বড় (বছরে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েনের বেশি), তবে সরাসরি উপস্থিতি এবং ক্রেতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে রিসেল মার্কেট এখন বেশ এগিয়ে।
জাপানে পুরনো পোশাকের বাজারের এই প্রসারের প্রধান চালিকাশক্তি হলো কঠোর অর্থনৈতিক বাস্তবতা। গত ৩০ বছরে দেশটিতে প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদী মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে, যেখানে আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তরুণ ক্রেতারা, যারা দামের ব্যাপারে খুবই সচেতন, সীমিত বাজেটে স্টাইলিশ পোশাক পরার উপায় খুঁজছেন। জাপানের ঐতিহ্যবাহী 'মোত্তাইনাই' (অপচয় না করা ও জিনিসের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা) দর্শন কয়েক দশক ধরে পণ্য যত্নে রাখার সংস্কৃতি তৈরি করেছে। তবে কেবল বর্তমান সময়ে এসে এটি প্রথাগত অভ্যাস থেকে একটি জনপ্রিয় ধারায় পরিণত হয়েছে। জেনারেশন জেড এবং মিলেনিয়ালরা এখন ব্যবহৃত জিনিস কেনাকে লজ্জাজনক মনে করেন না—বরং এটি এখন পরিবেশ সচেতনতা ও আধুনিক রুচির প্রতীক হয়ে উঠেছে। এর ফলে রিসেল মার্কেট কেবল 'দরিদ্রদের পছন্দ' না থেকে মধ্যবিত্তদের কেনাকাটার একটি যুক্তিসঙ্গত কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বজুড়েই সেকেন্ড-হ্যান্ড বাজার বড় হচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী সংস্থার (GlobalData, ThredUp) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে পোশাকের বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ১০-১২ শতাংশই সেকেন্ড-হ্যান্ড খাতের দখলে থাকবে। জাপান এখনই এই প্রবণতার শীর্ষে রয়েছে।
প্রথমত—বিলাসবহুল পণ্যের বিশাল সমাহার। ১৯৮০-এর দশকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সময় জাপান বিপুল পরিমাণে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডের পণ্য সংগ্রহ করেছিল, যার ফলে বর্তমানে জাপানি বাজারে ব্যবহৃত লাক্সারি পণ্যের বিশাল মজুদ রয়েছে।
দ্বিতীয় বিষয়: জাপানিরা প্রথাগতভাবেই জিনিসপত্র খুব যত্ন করে ব্যবহার করেন, তাই ব্যবহৃত পণ্যগুলোও প্রায় নতুনের মতোই থাকে, যা লাক্সারি পণ্যের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলস্বরূপ, জাপানি বাজার এখন খুব সামান্য ব্যবহারের ছাপ থাকা আসল লাক্সারি পণ্যে পরিপূর্ণ।
আর তৃতীয় তুরুপের তাস হলো সরকারি সমর্থন। অনেক দেশে রিসেল মার্কেট কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে উঠলেও জাপানে এই প্রক্রিয়াটি সরকারি স্তরে সরাসরি সহায়তা পাচ্ছে, যদিও তাতে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। ১৯৯১ সাল থেকেই সরকার ধারাবাহিকভাবে ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতিকে উৎসাহিত করে আসছে এবং রিসেল মার্কেটকে ‘প্রধান মডেল’ হিসেবে ঘোষণা না দিলেও জাতীয় কৌশলে একে গুরুত্ব দিচ্ছে। জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় (METI) ফ্যাশন শিল্পে ‘আপসাইক্লিং’ এবং টেকসই উন্নয়নের নীতিমালা প্রণয়ন করছে, ই-কমার্স খাতে সহায়তা দিচ্ছে এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজতর করছে, পাশাপাশি ‘কুল জাপান’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও ভিন্টেজ সংস্কৃতিকে প্রসারে ভূমিকা রাখছে। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের সরকারি লক্ষ্যমাত্রাও সেকেন্ড-হ্যান্ড ব্যবসার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলস্বরূপ, ২০২৫ সালে জাপানি সেকেন্ড-হ্যান্ড বাজারের মূল্য ৬৯.৩২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং এটি ক্রমাগত দুই অঙ্কের হারে বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এর আকার ৪.৬ ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছাবে।
বাজারের এই দ্রুত বৃদ্ধির একটি নেতিবাচক দিকও আছে। বিক্রির পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে নকল পণ্যের সংখ্যাও বাড়ছে। জাপানে ব্যবহৃত পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে কঠোর আইন (Kobutsusho) রয়েছে, যেখানে বিক্রেতাদের লাইসেন্স থাকা এবং হিসাব রাখা বাধ্যতামূলক। তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (Mercari, Yahoo Auctions) এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে রপ্তানি বাড়ায় বাজার নকল লাক্সারি ব্র্যান্ডে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মগুলো এআই (AI) যাচাইকরণ এবং বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিলেও বিশেষ করে হার্মিস, শ্যানেল ও রোলেক্সের মতো ব্র্যান্ডের নকল পণ্য এখনও বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে, যদিও অন্যান্য দেশের তুলনায় জাপানে এর মাত্রা অনেক কম।
ইউনিক্লো-ও জাপানি দর্শনের সাথে বেশ মানানসই: সাশ্রয়ী মূল্যে সহজবোধ্য স্টাইল এবং গুণগত মান। তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, ইউনিক্লো স্থবির হয়ে নেই; তারা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন শোরুম খুলে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা বাড়াচ্ছে। কিন্তু ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ মডেলটি এখন বাধার মুখে পড়ছে এবং এটি কেবল জাপানের চিত্র নয়। বয়স্ক ক্রেতাদের ওয়ারড্রোব এখন সমৃদ্ধির সময়ে কেনা উন্নতমানের পোশাকে ঠাসা, যার ফ্যাশন মূল্য তারা এখনও পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারেননি। তরুণ ফ্যাশন সচেতনরা সব সময় অনন্য কিছুর সন্ধানে থাকেন। আর অনেকের কাছেই এটি একটি অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার বিষয়: ১,৯৯০ ইয়েন দিয়ে নতুন টি-শার্ট কেনার কী দরকার, যদি ‘সেকেন্ড স্ট্রিট’-এ একই দামে কোনো নামী ব্র্যান্ডের লাক্সারি পণ্য পাওয়া যায়?
মজার ব্যাপার হলো, ইউনিক্লো নিজেও পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে সেকেন্ড-হ্যান্ড পপ-আপ শোরুম চালু করছে, তবে এখন পর্যন্ত এটিকে কেবল প্রচলিত ধারার সাথে তাল মেলানোর একটি বিলম্বিত প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।
জাপানে যা ঘটছে তা কেবল স্থানীয় বাজারের পরিবর্তন নয়। এটি মূলত একটি ‘পোস্ট-গ্রোথ’ অর্থনীতির পরীক্ষা ক্ষেত্র, যেখানে উন্নত অবকাঠামো, জীবনযাত্রার উচ্চ মান এবং বয়স্ক জনসংখ্যার একটি দেশ দেখাচ্ছে যে টেকসই ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে:
নতুন উৎপাদন কমিয়ে পুনর্ব্যবহার বাড়ানো;
পরিমাণের চেয়ে গুণগত মানকে গুরুত্ব দেওয়া;
নতুনত্বের চেয়ে ঐতিহ্যের মূল্য দেওয়া;
টেকসই উন্নয়নের বিষয়টিকে কেবল বিপণন কৌশল হিসেবে নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা।




