ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি বার্কলের (University of California, Berkeley) বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক আবিষ্কার গবেষকদের পরিচিত বাস্তুসংস্থান এবং প্রাণীদের সুপ্ত শারীরতত্ত্ব সম্পর্কে ভিন্নভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। দেখা গেছে যে, সাধারণ মৌমাছি এবং হামিংবার্ড তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে অজান্তেই নিয়মিত অ্যালকোহল গ্রহণ করে। একটি নতুন বড় মাপের জৈবিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, অনেক সপুষ্পক উদ্ভিদের নেক্টারে প্রাকৃতিক উপায়ে সামান্য পরিমাণে অ্যালকোহল থাকে। ফুলের কলিতে বহিরাগত অণুজীবের সাথে প্রবেশকারী আণুবীক্ষণিক ঈস্টের সক্রিয়তায় এই রাসায়নিক প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা মিষ্টি রসে থাকা শর্করাকে গেঁজে তুলে অ্যালকোহল তৈরি করে।
এর ফলে, বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরাগায়নকারী পাখি এবং পতঙ্গরা সারা দিনে তাদের প্রতিটি আহারের সময় অ্যালকোহলের সংস্পর্শে আসে। আপাতদৃষ্টিতে নেক্টারে ইথানলের এই ঘনত্ব মানুষের কাছে খুব সামান্য মনে হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা এই ক্ষুদ্র প্রাণীদের ওজন এবং শক্তি বজায় রাখতে প্রতিদিন তারা যে বিশাল পরিমাণ তরল খাবার গ্রহণ করে, তা বিবেচনায় নিয়ে নিখুঁত গাণিতিক হিসাব করেছেন। দেখা গেছে, শরীরের ওজনের অনুপাতে কিছু প্রজাতির হামিংবার্ড এবং বুনো মৌমাছি প্রতিদিন যে পরিমাণ অ্যালকোহল গ্রহণ করে, তা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন এক গ্লাস মদ্যপানের সমতুল্য।
জীববিজ্ঞানীদের জন্য সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কার ছিল এই যে, এই প্রাণীদের মধ্যে মাতাল হওয়া, ধীর প্রতিক্রিয়া বা বিষক্রিয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। পাখিরা ওড়ার সময় অত্যন্ত জটিল কৌশলে চলাফেরার ক্ষেত্রেও নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখে এবং মৌমাছিরা কোনো ভুল ছাড়াই পথ চিনে তাদের চাকে ফিরে আসতে পারে। এটি নির্দেশ করে যে, দীর্ঘকালীন যৌথ বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় এই পরাগায়নকারীদের মধ্যে ইথানলের প্রতি এক অনন্য ও অতি-কার্যকর সহনশীলতা তৈরি হয়েছে, যা তাদের মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়াকে স্বাস্থ্য বা অভ্যন্তরীণ অঙ্গের ক্ষতি ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে বিষাক্ত পদার্থ ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে।
এই আবিষ্কার উদ্ভিদ এবং প্রাণীর পারস্পরিক সম্পর্কের দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। আগে ধারণা করা হতো যে, ফুলের নেক্টার কেবল কার্বোহাইড্রেট শক্তির একটি বিশুদ্ধ এবং নিরাপদ উৎস। এখন বিজ্ঞানীদের আরও গভীরভাবে গবেষণা করতে হবে যে, এই গোপন অ্যালকোহল উপাদানটি বাস্তুসংস্থানের সম্পর্ক এবং বন্যপ্রাণীদের সামাজিক আচরণে ঠিক কীভাবে প্রভাব ফেলে। এছাড়া, মৌমাছি এবং হামিংবার্ডকে অ্যালকোহলের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষাকারী জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলোর বিস্তারিত গবেষণা বিবর্তনীয় মেটাবলিজম এবং পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে প্রাণীদের অভিযোজন বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।


