ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে কেবল মূল্যায়নেই নয়, সাম্প্রতিক সমঝোতার ব্যাখ্যা নিয়েও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ দেশটির কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলছেন যে ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে, তবে ইরানি পক্ষ এই দাবি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে, যা এই সমঝোতার বাস্তবতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গত ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেন যে, ইরান তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আইএইএ পরিদর্শকদের আবারও আমন্ত্রণ জানাতে সম্মত হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহেই বিশেষজ্ঞরা সেখানে পৌঁছাতে পারেন। ওয়াশিংটনে এই বক্তব্যকে একটি বড় কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইরান উচ্চ-পর্যায়ের পরিদর্শনের বিষয়ে "পুরোপুরি এবং সম্পূর্ণভাবে" সম্মত হয়েছে।
তবে ২৩ জুন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই দাবিগুলো জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। তার মতে, পরিদর্শন শুরুর বিষয়ে তেহরান ও আইএইএ-র মধ্যে এখনও কোনো চুক্তি হয়নি, আইএইএ-র মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গেও কোনো বৈঠক হয়নি এবং বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনাও তাদের নেই। এই কূটনীতিক সাফ জানিয়েছেন, "উভয় প্রশ্নের উত্তরই হলো—না।" ইরানের সংবাদ সংস্থা ইরনা (IRNA) জানিয়েছে, ইরান আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে মোটেও কথা বলেনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতিও দেয়নি।
অবস্থানের এই বৈপরীত্য একটি গভীর সমস্যাকে ফুটিয়ে তোলে: ১৮ জুন সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক রিসোর্টে ১৮ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনার পর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বিষয়বস্তুকে একেক পক্ষ একেকভাবে ব্যাখ্যা করছে। ইরানি প্রতিনিধি দলে ছিলেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি; অন্যদিকে আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সহায়তায় মার্কিন পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স।
সমঝোতা স্মারকের শর্তানুযায়ী, পারমাণবিক কর্মসূচির চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষই ৬০ দিনের একটি আলোচনার সময়সীমা নির্ধারণে সম্মত হয়েছে, যেখানে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ (যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি বলে ধারণা করা হয়) এবং নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার করেছে, আর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আলোচনা শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এই ৬০ দিনের সময়সীমার মধ্যে আইএইএ-র ভূমিকা উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছিল—তবে ওয়াশিংটন একে সক্রিয় পর্যবেক্ষণ এবং নতুন পরিদর্শন হিসেবে দেখলেও তেহরান জোর দিচ্ছে যে, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের বিষয়টি আলোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে এবং এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটবে না। ফলস্বরূপ, দুই রাজধানী থেকে আসা পরস্পরবিরোধী সংকেতগুলো এই ভঙ্গুর সমঝোতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং চুক্তির স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
কূটনীতি কি ব্যাখ্যার এই মৌলিক পার্থক্যগুলো কাটিয়ে উঠতে পারবে—আগামী সপ্তাহগুলোতে এটাই হবে মূল প্রশ্ন। বিবৃতির এই সংঘাত প্রমাণ করে যে, নিবিড় আলোচনার পরেও পারমাণবিক যাচাইকরণের মূল উপাদানগুলো নিয়ে পক্ষগুলো সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে রয়ে গেছে, যা চূড়ান্ত সমাধানের সম্ভাবনাকে ব্যাপকভাবে জটিল করে তুলছে।



