তারা তিনবার দেহ পরিবর্তন করে: যেভাবে বংশবৃদ্ধি করে ইল মাছ — এক রহস্যময় মাছ যার অস্তিত্ব থাকার কথা নয়

লেখক: Svitlana Velhush

তারা তিনবার দেহ পরিবর্তন করে: যেভাবে বংশবৃদ্ধি করে ইল মাছ — এক রহস্যময় মাছ যার অস্তিত্ব থাকার কথা নয়-1

নদীর ইল মাছের (বিশেষ করে ইউরোপীয় এবং আমেরিকান প্রজাতির) প্রজনন প্রক্রিয়া জীববিজ্ঞানের অন্যতম বিস্ময়কর এবং দীর্ঘকাল ধরে রহস্যে ঘেরা একটি বিষয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের কাছে এটি পরিষ্কার ছিল না যে এই মাছগুলো কোথা থেকে আসে, কারণ নদীতে কেউ কখনো এদের ডিম বা পোনা দেখেনি। উদাহরণস্বরূপ, অ্যারিস্টটল মনে করতেন যে এরা কাদা থেকে জন্মায়।

বাস্তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে ঠিক যেভাবে ঘটে:

১. যাত্রার প্রস্তুতি (রূপান্তর)

ইল মাছ তাদের জীবনের অধিকাংশ সময় (৫–১৫ বছর বা তারও বেশি) ইউরোপ বা আমেরিকার মিষ্টি পানিতে (নদী, হ্রদ) কাটায়। যখন তাদের প্রজননের সময় আসে, তখন মাছগুলোর শরীরে এক অবিশ্বাস্য রূপান্তর ঘটে:

তারা তিনবার দেহ পরিবর্তন করে: যেভাবে বংশবৃদ্ধি করে ইল মাছ — এক রহস্যময় মাছ যার অস্তিত্ব থাকার কথা নয়-4
  • তারা খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দেয়।
  • তাদের গায়ের রঙ হলদে-সবুজ (হালকা পেট) থেকে রূপালী রঙে (সাদা পেট এবং গাঢ় পিঠ) পরিবর্তিত হয়।
  • মহাসাগরের গভীর অন্ধকার এলাকায় ভালো দেখার সুবিধার্থে তাদের চোখ আকারে বড় হয়ে যায়।
  • তাদের পরিপাকতন্ত্র অকেজো হয়ে যায় এবং জনন অঙ্গগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে।

এই ধরণের ইল মাছকে রূপালী ইল বলা হয়।

২. মহা-অভিপ্রয়াণ

তারা তিনবার দেহ পরিবর্তন করে: যেভাবে বংশবৃদ্ধি করে ইল মাছ — এক রহস্যময় মাছ যার অস্তিত্ব থাকার কথা নয়-6

রূপালী ইল মাছগুলো নদী থেকে মহাসাগরে চলে আসে এবং হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এক যাত্রা শুরু করে।

  • ইউরোপীয় ইল মাছগুলো সারগাসো সাগরের দিকে (আটলান্টিক মহাসাগরের একটি শৈবালসমৃদ্ধ অঞ্চল, যা বারমুডা দ্বীপপুঞ্জ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাঝে অবস্থিত) সাঁতরে চলে।
  • এই পথ পাড়ি দিতে তাদের প্রায় ৬-৮ মাস সময় লাগে।

৩. ডিম ছাড়া

এটি সবচেয়ে গোপনীয় পর্যায়। ইল মাছগুলো সারগাসো সাগরের অত্যন্ত গভীরে (প্রায় ৪০০–৭০০ মিটার, কোনো কোনো তথ্যমতে ১৫০০ মিটার পর্যন্ত) সমবেত হয়।

  • সেখানে তারা ডিম পাড়ে এবং শুক্রাণু ত্যাগ করে।
  • গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: প্রজননের পর সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক ইল মাছ মারা যায়; তারা জীবনে কেবল একবারই বংশবৃদ্ধি করে।

৪. লার্ভা পর্যায় (লেপ্টোসেফালাস)

ডিম ফুটে এমন লার্ভা বের হয় যা দেখতে প্রাপ্তবয়স্ক ইল মাছের মতো মোটেও নয়।

  • এদেরকে লেপ্টোসেফালাস বলা হয়।
  • এরা স্বচ্ছ, চ্যাপ্টা এবং দেখতে অনেকটা উইলো পাতার মতো।
  • তাদের শরীরে লোহিত রক্তকণিকা থাকে না এবং তারা "সামুদ্রিক তুষার" (জৈব অবশিষ্টাংশ) খেয়ে বেঁচে থাকে।
  • এই লার্ভাগুলো সক্রিয়ভাবে সাঁতার কাটে না, বরং সমুদ্রস্রোতে (গালফ স্ট্রিম) ভেসে ইউরোপের দিকে এগিয়ে যায়। এই ভাসমান অবস্থা ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময়ের মধ্যে তারা কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা হয়।

৫. প্রত্যাবর্তন (গ্লাস ইল)

তারা তিনবার দেহ পরিবর্তন করে: যেভাবে বংশবৃদ্ধি করে ইল মাছ — এক রহস্যময় মাছ যার অস্তিত্ব থাকার কথা নয়-12

ইউরোপের উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছে লার্ভাগুলো আবার নতুন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়:

  • এরা সরু ও নলাকার আকৃতি ধারণ করে কিন্তু তখনও স্বচ্ছ থাকে। এখন এদের গ্লাস ইল বা স্বচ্ছ ইল বলা হয়।
  • এরা নদীর মোহনায় প্রবেশ করে এবং স্রোতের বিপরীতে উজানে চলতে শুরু করে।

৬. পূর্ণতাপ্রাপ্তি (হলুদ ইল)

নদীর উজানে যাওয়ার সময় ইল মাছগুলো রঞ্জক পদার্থ লাভ করে (পিঠ গাঢ় এবং পেট হালকা হয়) এবং হলুদ ইলে পরিণত হয়। এই অবস্থায় তারা বহু বছর বাস করে, বড় হয় এবং খাবার খায়, যতক্ষণ না জীবনচক্রটি আবার শুরু হয়।

সংক্ষিপ্ত সারমর্ম: ইল মাছের জন্ম হয় লোনা পানিতে (সারগাসো সাগর), বেড়ে ওঠে মিষ্টি পানিতে (ইউরোপের নদী), আর নতুন প্রজন্মের জন্ম দিয়ে মারা যাওয়ার জন্য আবারো মহাসাগরে ফিরে যায়।

30 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।