শক্তির জন্য অপরিহার্য চিনি একই সাথে শরীরে এমন এক ধীর গতির রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়, যা টিস্যুগুলোকে ধীরে ধীরে শক্ত ও প্রদাহপ্রবণ করে তোলে। অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন অ্যান্ড-প্রোডাক্টস (AGEs) কোলাজেন এবং অন্যান্য প্রোটিনে জমা হতে থাকে এবং এমন এক ধরনের ‘ক্রস-লিঙ্ক’ বা আড়াআড়ি বন্ধন তৈরি করে, যা শরীর সহজে ভাঙতে পারে না।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, বয়সের সাথে সাথে এই যৌগের মাত্রা বাড়তে থাকে এবং ডায়াবেটিস বা স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে বেশি থাকে। রক্তনালী ও কিডনিতে এই আড়াআড়ি বন্ধনগুলো দেয়াল পুরু করে দেয় এবং স্থিতিস্থাপকতা কমিয়ে ফেলে, যা উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ত্বকের ক্ষেত্রে এটি ডার্মিস স্তরকে কম নমনীয় করে তোলে এবং মস্তিষ্কে আলঝেইমার রোগের প্লাক তৈরিতে সহায়তা করে।
মূল প্যারাডক্স বা বৈপরীত্য হলো এই যে, সব গ্লাইকেশন অ্যান্ড-প্রোডাক্ট সমানভাবে ক্ষতিকর নয়। সিএমএল (CML)-এর মতো কিছু উপাদান মূলত রেজ (RAGE) রিসেপ্টরের মাধ্যমে প্রদাহ সৃষ্টি করে, আবার পেন্টোসিডিনের মতো অন্যান্য উপাদান কোলাজেনে শক্ত বন্ধন তৈরি করে। গবেষণাগারের তথ্য অনুযায়ী শেষোক্ত উপাদানগুলো জয়েন্টের নমনীয়তা হ্রাস এবং ধমনী শক্ত হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখে, যদিও রেজ (RAGE) ব্লক করার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে এখন পর্যন্ত মিশ্র ফলাফল পাওয়া গেছে।
কোলাজেন তন্তুগুলোকে জুতোর ইলাস্টিক ফিতার মতো কল্পনা করুন: সময়ের সাথে সাথে এগুলো এক ধরনের অদৃশ্য আঠায় ঢেকে যায় যা ফিতাগুলোকে একে অপরের সাথে আটকে ফেলে। প্রতি পদক্ষেপে ইলাস্টিকগুলো প্রসারিত হওয়ার ক্ষমতা হারাতে থাকে এবং জুতোর গায়ে ফাটল ধরতে শুরু করে। একইভাবে ধমনীর ক্ষেত্রেও ঘটে: রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে এগুলো প্রসারিত হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ক্যালরি গ্রহণ সীমিত করা এবং উচ্চ গ্লাইকেটেড যৌগসমৃদ্ধ খাবার (ভাজা মাংস, অতি-প্রক্রিয়াজাত মিষ্টি) কমানোর ফলে প্রাণীদের দেহে এই উপাদানগুলোর জমা হওয়া ধীর হয়ে যায়। মানুষের ক্ষেত্রে এর সরাসরি প্রমাণ এখনও পর্যাপ্ত নয় এবং বড় ধরনের গবেষণাগুলো কেবল পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। ‘এজিই-ব্রেকার’ (AGE-breakers) বা এই বন্ধন ভাঙার ওষুধ তৈরির প্রচেষ্টা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে এখন পর্যন্ত প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল পর্যায়ের গণ্ডি পেরোতে পারেনি।
পরিশেষে, গ্লাইকেশন অ্যান্ড-প্রোডাক্ট বার্ধক্যের মূল কারণ নয়, বরং এটি এমন একটি স্থায়ী প্রক্রিয়া যা অন্যান্য কারণে সৃষ্ট ক্ষতির পরিমাণকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এদের ভূমিকা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন রক্ষাকারী মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া একই সাথে এমন কিছু বর্জ্য তৈরি করে যা শরীরকে দশকের পর দশক ধরে সহ্য করতে হয়।



