২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল প্যারিসে ইউনেস্কো গ্লোবাল জিওপার্কস নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত হওয়া নতুন অঞ্চলগুলোকে স্বীকৃতিপত্র প্রদানের একটি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বিজ্ঞানী এবং কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফসল এটি, যারা আবেদনপত্র তৈরি থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়নে নিরলস কাজ করেছেন। নতুন এই তালিকার মধ্যে জাপানের কার্স্ট ভূদৃশ্য, বাশকোর্তোস্তানের প্রাচীন প্রবালপ্রাচীর, পশ্চিম আয়ারল্যান্ডের হিমবাহ অঞ্চল এবং দক্ষিণ ফ্রান্সের লাল পাহাড়গুলো অন্যতম। এই প্রতিটি স্থানই কেবল তাদের অনন্য ভূ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জন্যই নয়, বরং প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিশেষ গুরুত্বের কারণেও একত্রিত হয়েছে। বর্তমানে ইউনেস্কোর এই জিওপার্কগুলো বিশ্ব পরিবেশগত এবং বৈজ্ঞানিক কর্মপরিকল্পনার এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হচ্ছে। এগুলো এমন এক একটি অঞ্চল যেখানে প্রকৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি গবেষণা, শিক্ষা এবং স্থানীয় জনপদকে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ফ্রান্সের ‘তের দ্যেরোঁ’ (Terres d’Hérault) ইউনেস্কো গ্লোবাল জিওপার্ক
২০২৬ সালের নতুন ইউনেস্কো জিওপার্কগুলোর মধ্যে দক্ষিণ ফ্রান্সের অক্সিটানিয়া অঞ্চলের তের দ্যেরোঁ (Terres d’Hérault) অন্যতম। কয়েক বছরের প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা এবং এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মূল্যায়নের পর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তটি অনুমোদিত হয়। এই জিওপার্কটি এরো (Hérault) বিভাগের একশোরও বেশি ছোট এলাকা বা কমিউনকে একত্রিত করেছে এবং প্রায় ৫৪ কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসকে ধারণ করছে। এর প্রধান আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে সালাগু হ্রদ (Lac du Salagou), নাভাসেল সার্ক, কার্স্ট ভূদৃশ্য এবং কুমিয়াকের মার্বেল খনি। এই অঞ্চলটি বিশেষভাবে ‘রুফে’ নামে পরিচিত এখানকার লাল বেলেপাথরের জন্য বিখ্যাত, যা আয়রন অক্সাইডে সমৃদ্ধ। এই শিলাগুলো প্রায় ২৫ কোটি বছর আগে গঠিত হতে শুরু করেছিল। লালচে পাহাড় আর ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্ট সালাগু হ্রদের নীলচে জলের বৈপরীত্য এই দৃশ্যপটকে দক্ষিণ ফ্রান্সের অন্যতম পরিচিত ল্যান্ডস্কেপে পরিণত করেছে। ইউনেস্কোর নথিপত্রে এই এলাকাটিকে পৃথিবীর এক ধরনের ‘উন্মুক্ত গবেষণাগার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে টেকটোনিক প্রক্রিয়া, ক্ষয়, পলি জমা এবং প্রাচীন জলবায়ু পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এখানকার ভূ-তত্ত্ব অক্সিটানিয়ার সাংস্কৃতিক পরিবেশ—বিশেষ করে আঙুর বাগান, গ্রামীণ জনপদ এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে মিশে আছে।
আয়ারল্যান্ডের ‘জয়েস কান্ট্রি অ্যান্ড ওয়েস্টার্ন লেকস’ জিওপার্ক
পশ্চিম আয়ারল্যান্ডের জয়েস কান্ট্রি অ্যান্ড ওয়েস্টার্ন লেকস জিওপার্কটিও ইউনেস্কোর নতুন তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। গ্যালওয়ে এবং মেয়ো কাউন্টির কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত এই এলাকায় কনেমারা অঞ্চল, কিলারি হারবার উপসাগর, লঘ করিব ও লঘ মাস্ক হ্রদ এবং মাইলরিয়া পর্বতমালা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস প্রায় ৭০ কোটি বছর আগের। এখানে প্রাচীন শিলা, টেকটোনিক প্রক্রিয়ার চিহ্ন এবং শেষ হিমযুগের হিমবাহ দ্বারা গঠিত বিশেষ ভূদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। মূলত হিমবাহের সক্রিয়তার কারণেই এখানকার উপত্যকা এবং হ্রদগুলো তাদের বর্তমান রূপ পেয়েছে। কিলারি হারবারকে প্রায়ই আয়ারল্যান্ডের একমাত্র খাঁড়ি (fjord) বলা হয়, যদিও ভূতাত্ত্বিকরা একে প্লাবিত নদী উপত্যকা বা ‘রিয়া’ বলে মনে করেন। তা সত্ত্বেও, সমুদ্রের এই সংকীর্ণ খাঁড়িটি দেশটির পশ্চিম উপকূলের সবচেয়ে চমৎকার প্রাকৃতিক স্থানগুলোর মধ্যে একটি হয়ে আছে। এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক গুরুত্বও অপরিসীম। জিওপার্কটির প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা গেল্টাক্ট অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে এখনও দৈনন্দিন জীবনে আইরিশ ভাষা ব্যবহার করা হয়। আয়ারল্যান্ড দ্বীপের এটিই প্রথম জিওপার্ক যেখানে আইরিশ ভাষাভাষী অঞ্চলের এতো বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জাপানের আকিয়োশিডাই কার্স্ট মালভূমি জিওপার্ক
জাপানের ইয়ামাগুচি প্রিফেকচারের মাইন-আকিয়োশিডাই কার্স্ট মালভূমিও ইউনেস্কো জিওপার্কের মর্যাদা পেয়েছে, যা জাপানের বৃহত্তম কার্স্ট অঞ্চল। এই এলাকার চুনাপাথরের মালভূমিগুলো প্রায় ৩৫ কোটি বছর আগে কার্বনিফেরাস যুগের প্রাচীন প্রবালপ্রাচীর থেকে তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে টেকটোনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সামুদ্রিক গঠনগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে উঠে আসে এবং চুনাপাথরের মাঠ, ভূগর্ভস্থ নদী ও ডোলাইনসহ এক জটিল কার্স্ট ব্যবস্থা তৈরি করে। এই অঞ্চলের প্রধান প্রাকৃতিক আকর্ষণ হলো ১০ কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা আকিয়োশি-দো গুহা, যা জাপানের অন্যতম বৃহত্তম চুনাপাথরের গুহা। এর ভেতরে ভূগর্ভস্থ জলধারা, চুনাপাথরের ধাপ এবং বিশাল প্রাকৃতিক কক্ষ রয়েছে। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই গুহাটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত এবং এটি জাপানি গুহা গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই জিওপার্কটি কার্স্ট প্রক্রিয়ার পর্যবেক্ষণ এবং মালভূমির নাজুক বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কাজ করছে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্ষয়কে দীর্ঘমেয়াদী প্রাকৃতিক ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাশিয়ার বাশকোর্তোস্তানের ‘তোরাতৌ’ জিওপার্ক
বাশকোর্তোস্তানের ‘তোরাতৌ’ জিওপার্কটিও আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনেস্কো গ্লোবাল জিওপার্কস নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০২০ সালে মর্যাদা পাওয়া ‘ইয়নগান-তাউ’-এর পর এটি এই প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় ইউনেস্কো জিওপার্ক। এই এলাকার প্রধান নিদর্শন হলো তোরাতৌ, ইউরাকতাউ এবং কুশতৌ নামক শিহান বা বিচ্ছিন্ন টিলা। এই বিচ্ছিন্ন চুনাপাথরের পাহাড়গুলো মূলত প্রায় ২৯-২৮ কোটি বছর আগের পারমিয়ান সাগরের প্রাচীন প্রবালপ্রাচীরের অবশিষ্টাংশ।
বাশকিরিয়ার এই শিহানগুলোকে অনন্য ভূতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এ ধরনের প্রবাল ব্যবস্থা ভূপৃষ্ঠে এত সুসংরক্ষিত এবং নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার উপযোগী অবস্থায় খুব কমই দেখা যায়। এলাকাটির গুরুত্ব কেবল ভূ-তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও এর ভূমিকা অপরিসীম। উসোলকা এবং ডালনি টিউলকাস নামের আন্তর্জাতিক স্ট্র্যাটিগ্রাফিক মানদণ্ডগুলো এই জিওপার্কের অন্তর্ভুক্ত। শিলাস্তরের এই ছেদগুলো ভূতাত্ত্বিক যুগের সীমানা নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
জিওপার্কের প্রাকৃতিক নিদর্শনের মধ্যে হাজার হাজার বছর ধরে তৈরি হওয়া প্রাচীন বরফ সমৃদ্ধ আসকিনস্কায়া গুহা, উরাল অঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ কিন্ডারলিনস্কায়া গুহা এবং বসন্তকালে যৌবন ফিরে পাওয়া ঋতুভিত্তিক জলপ্রপাত কুক-কারাউক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রাকৃতিক দৃশ্যে পৃথিবীর ইতিহাস: নতুন জিওপার্কগুলোর মেলবন্ধন
২০২৬ সালের নতুন ইউনেস্কো জিওপার্কগুলো পৃথিবীর ইতিহাস যে কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে—তা প্রমাণ করে, যেখানে প্রাচীন সমুদ্র ও প্রবালপ্রাচীর থেকে শুরু করে কার্স্ট ব্যবস্থা এবং হিমবাহের ভূচিত্র স্থান পেয়েছে। এই অঞ্চলগুলো এখন বিশ্বব্যাপী এমন এক নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠছে যেখানে প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক মানের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
"প্রতিটি শিলাস্তর, প্রতিটি গিরিখাত এবং প্রতিটি জীবাশ্ম এমন এক ইতিহাস বর্ণনা করে যা সমগ্র মানবজাতির সম্পদ। মাত্র দশ বছরে ইউনেস্কো গ্লোবাল জিওপার্কগুলো এটি প্রমাণ করেছে যে ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রক্ষা করা মানেই বিজ্ঞানের প্রসার, শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বনির্ভরতা বাড়ানো। ৫১টি দেশের ২৪১টি স্থানকে যা একসূত্রে গেঁথেছে, তা কেবল তাদের ভূতাত্ত্বিক গুরুত্বই নয় বরং স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে প্রধান্য দিয়ে জ্ঞান বিনিময়ের এক অভিন্ন অঙ্গীকার।" — খালেদ আল-আনানি, ইউনেস্কোর মহাপরিচালক।
জিওপার্ক নেটওয়ার্কের এই সম্প্রসারণ মূলত অনন্য প্রাকৃতিক অঞ্চলগুলো সংরক্ষণের প্রতি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক আগ্রহেরই প্রতিফলন—যেখানে এই স্থানগুলো কেবল বিজ্ঞানের বিষয় নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের ধারক হিসেবে বিবেচিত হয়।




