জগত সম্পর্কে আমাদের সাধারণ উপলব্ধির সাথে অদ্বৈত অবস্থার (non-duality) পার্থক্য ঠিক কোথায়? নতুন একটি গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এর উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে মস্তিষ্কের নিজস্ব নিউরাল নেটওয়ার্কের ভেতর সময়ের প্রবাহকে সাজানোর পদ্ধতির মধ্যে।

ব্যাঙ্গালোরের নিমহ্যান্স (NIMHANS) নিউরোফিজিওলজি ল্যাবরেটরিতে ইশা যোগের অভিজ্ঞ চর্চাকারীরা দুটি ভিন্ন কাজ সম্পন্ন করেন: প্রথমে তারা শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর নজর দিয়ে নিজেদের মনোযোগ অন্তর্মুখী করেন এবং পরে একটি ভিজ্যুয়াল টাস্ক সমাধান করেন যেখানে বাহ্যিক উদ্দীপনার দিকে মনোযোগ দিতে হয়। এই পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফির মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা নথিভুক্ত করেন।
২০২৬ সালের জুন মাসে 'কমিউনিকেশনস বায়োলজি' (Communications Biology) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় একটি কৌতূহল উদ্দীপক ধরন লক্ষ্য করা গেছে। শিক্ষানবিশ এবং সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, শ্বাস-প্রশ্বাসের পর্যবেক্ষণের সময় তাদের অভ্যন্তরীণ নিউরাল টাইমস্কেল বা সময়ের পরিধি দীর্ঘ ছিল এবং বাহ্যিক কাজের সময় তা সংক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তবে অভিজ্ঞ ধ্যানীদের ক্ষেত্রে এই ব্যবধানটি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
মস্তিষ্কের এই স্নায়বিক সক্রিয়তার সাময়িক বিন্যাস পরিমাপ করার জন্য গবেষকরা 'অটো-কো-রিলেশন উইন্ডো' (ACW) নামক একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা থেকে বোঝা যায় একটি নিউরাল সিস্টেম কতক্ষণ তার আগের অবস্থার তথ্য ধরে রাখতে পারে। সবচেয়ে অভিজ্ঞ চর্চাকারীদের ক্ষেত্রে ঠিক এই সূচকটিই অন্তর্মুখী এবং বহির্মুখী মনোযোগের সময় প্রায় একই রকম বলে প্রমাণিত হয়েছে।
এই গবেষণার লেখক মাল্লিপেড্ডি সাকেত এবং নিমহ্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ অটোয়া এবং ইউনিভার্সিটি অফ লিয়েজের তার সহকর্মীরা আরও দেখতে পান যে, সময়ের এই সমন্বয়ের মাত্রা অদ্বৈত অনুভূতির ব্যক্তিগত মূল্যায়নের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। একটি স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ দলের ওপর পুনরায় পরীক্ষা চালিয়ে একই ফলাফল পাওয়া গেছে, যা এই পর্যবেক্ষণের নির্ভরযোগ্যতাকে আরও জোরালো করে।
সাধারণত মস্তিষ্ক অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা এবং বাহ্যিক ঘটনাগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ছন্দে প্রক্রিয়াজাত করে। নতুন এই তথ্য প্রমাণ করছে যে, অভিজ্ঞ ধ্যান চর্চাকারীদের মধ্যে এই পার্থক্যটি অনেক কম প্রকট হয়ে ওঠে। সম্ভবত নিউরাল ডায়নামিক্সের এই বৈশিষ্ট্যটিই সেই 'একাত্মবোধের' অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত, যা অদ্বৈত ধ্যানের চর্চাকারীরা প্রায়শই উল্লেখ করে থাকেন।
কল্পনা করুন একটি অর্কেস্ট্রা দল, যেখানে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের দল নিজ নিজ লয়ে বাজনা বাজাচ্ছে। হঠাৎ এক সময় সবার তাল মিলে যায় এবং পুরো সুরটি একটি অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ হিসেবে ধরা দেয়। মস্তিষ্কেও সম্ভবত এমনই কিছু ঘটে যখন অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী প্রক্রিয়ার মধ্যকার পার্থক্যগুলো অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
তবে গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, খুঁজে পাওয়া এই পারস্পরিক সম্পর্কগুলো কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণ করে না। এছাড়া এই গবেষণায় অদ্বৈত ধ্যানের সাথে অন্য কোনো ধ্যান পদ্ধতির তুলনা করা হয়নি এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
তা সত্ত্বেও এই গবেষণাটি অদ্বৈত চেতনার একটি সম্ভাব্য নিউরাল মার্কার বা স্নায়বিক সংকেত চিহ্নিত করেছে। ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত গবেষণা যদি এই ফলাফলকে সমর্থন করে, তবে মস্তিষ্ক কীভাবে আমাদের আলাদা 'সত্তা' বা 'আমি' বোধ তৈরি করে এবং কেন কিছু বিশেষ অবস্থায় ভেতর ও বাইরের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়, তা বুঝতে আমাদের সহায়ক হবে।




