অনুভূতি কি 'পড়া' সম্ভব? বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের সংকেত থেকে আবেগ বোঝার কাছাকাছি

লেখক: Elena HealthEnergy

অনুভূতি কি 'পড়া' সম্ভব? বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের সংকেত থেকে আবেগ বোঝার কাছাকাছি-1

কল্পনা করুন, রাতের একটি বিশাল শহর হলো আমাদের মস্তিষ্ক। বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার আলো একসাথে জ্বলছে আর নিভছে। প্রথম দেখায় এটি বিশৃঙ্খল মনে হলেও, দীর্ঘক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা ধরন ধরা পড়ে। যেমন, একজন মানুষ যখন সুখী থাকে তখন আলোর বিন্যাস একরকম হয়, আবার উদ্বেগের সময় তা সম্পূর্ণ বদলে যায়।

সম্প্রতি Nature Computational Science সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই কাজ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেছেন কীভাবে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেত আমাদের অনুভূতির সাথে যুক্ত থাকে।

এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ১৮ জন মৃগীরোগীর ওপর কাজ করেছেন, যাদের চিকিৎসার প্রয়োজনে আগে থেকেই মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড বসানো ছিল। অংশগ্রহণকারীরা যখন বিভিন্ন আবেগঘন ছবি এবং ভিডিও দেখছিলেন, তখন তারা ক্রমাগত তাদের অনুভূতিগুলো মূল্যায়ন করছিলেন। তারা জানাচ্ছিলেন সেই অনুভূতি কতটা সুখকর বা অস্বস্তিকর এবং তার তীব্রতা কেমন। একই সময়ে একটি কম্পিউটার তাদের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ রেকর্ড করছিল।

এরপর গবেষকরা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে প্রশিক্ষণ দেন যাতে এটি মস্তিষ্কের সংকেত এবং মানুষের অনুভূতির মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করতে পারে। এর ফলে সিস্টেমটি প্রায় রিয়েল-টাইমে বা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যক্তির মানসিক অবস্থা বেশ নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে শিখে যায়।

তবে গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি ছিল অন্য জায়গায়। এর আগে এই ধরনের বেশিরভাগ গবেষণায় কেবল মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বা ধূসর বস্তুর কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করা হতো, যেখানে নিউরনের মূল অংশগুলো থাকে। কিন্তু এই গবেষণার লেখকরা হোয়াইট ম্যাটার বা শ্বেত বস্তু থেকেও সংকেত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই শ্বেত বস্তু মূলত মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সংযোগকারী তার বা স্নায়ুতন্তুর মতো কাজ করে।

দেখা গেছে যে, এই স্নায়বিক মহাসড়কগুলোর মাধ্যমেই আবেগ সংক্রান্ত বিশাল পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান হয়। যখন এআই মডেলটি ধূসর এবং শ্বেত বস্তু উভয়কেই একসাথে বিবেচনা করল, তখন এর নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেল। এটি বিজ্ঞানীদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

মাত্র কয়েক বছর আগেও ধারণা করা হতো যে, আবেগ মূলত অ্যামিগডালার মতো নির্দিষ্ট কিছু কাঠামোতে তৈরি হয়। কিন্তু নতুন এই গবেষণা একটি জটিল চিত্র তুলে ধরেছে। কোনো অনুভূতি মস্তিষ্কের কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং কর্টেক্স, থ্যালামাস, লিম্বিক সিস্টেম এবং এদের সংযোগকারী স্নায়ুপথগুলোর একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই অনুভূতির জন্ম হয়।

তবে এখানে একটি কৌতূহলী দার্শনিক প্রশ্ন সামনে আসে যা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

যদি একটি কম্পিউটার বুঝতে পারে যে একজন ব্যক্তি উদ্বিগ্ন নাকি সুখী, তবে কি এর অর্থ এই যে কম্পিউটারটি তার অনুভূতি পড়তে পেরেছে?

বিষয়টি ঠিক তেমন নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গাণিতিক বিশ্লেষণ।

অ্যালগরিদমটি মূলত বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের সেই প্যাটার্নগুলো শনাক্ত করে যা সাধারণত নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত থাকে। এটি অনেকটা আবহাওয়া পূর্বাভাসের মতো। মেঘ, আর্দ্রতা এবং বায়ুচাপ দেখে আপনি বৃষ্টির পূর্বাভাস দিতে পারেন, কিন্তু যন্ত্রটি নিজে ভিজে মাটির গন্ধ বা বৃষ্টির ফোঁটার শীতলতা অনুভব করতে পারে না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। এটি আবেগ অনুমান করতে শিখেছে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে এটি ভেতর থেকে আনন্দ, ভয় বা ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ বোঝে। এটি কেবল তথ্যের বিন্যাস বিশ্লেষণ করে ফলাফল প্রদান করে।

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফলাফল। এটি প্রেডিক্টিভ প্রসেসিং তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয় মস্তিষ্ক ক্রমাগত শরীরের ভেতরে এবং বাইরের জগত সম্পর্কে ধারণা বা প্রেডিকশন তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে আবেগগুলো আলাদা কোনো সুখের বোতাম বা ভয়ের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে না, বরং মস্তিষ্কের প্রত্যাশার সাথে বাস্তব ঘটনার ক্রমাগত তুলনার ফল হিসেবে উদ্ভূত হয়।

এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যেহেতু সব অংশগ্রহণকারীই মৃগীরোগী ছিলেন, তাই এই ফলাফল সরাসরি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব নাও হতে পারে। এছাড়া অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাই তাদের আবেগ মূল্যায়ন করেছেন এবং রিয়েল-টাইম মোডটি এখন পর্যন্ত কেবল চারজন ব্যক্তির ওপর পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।

তা সত্ত্বেও, এই কাজ নিউরোটেকনোলজি বা স্নায়ুপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির প্রমাণ দেয়। ভবিষ্যতে এই ধরনের সিস্টেমগুলো বিষণ্ণতা, উদ্বেগের আক্রমণ বা মানসিক বিপর্যয় শুরু হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। এটি মানসিক ব্যাধির চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।

কিন্তু একই সাথে একটি নতুন নৈতিক প্রশ্নও দেখা দিচ্ছে যা সমাজকে ভাবিয়ে তুলছে। যদি প্রযুক্তি একদিন মস্তিষ্কের কার্যকলাপের মাধ্যমে আমাদের আবেগ খুব নির্ভুলভাবে চিনতে শিখে যায়, তবে চিকিৎসা সহায়তা এবং একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে সীমারেখা কোথায় টানা হবে? আগামী বছরগুলোতে স্নায়ুবিজ্ঞানের সামনে এটিই হতে পারে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

15 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • New Article out today! Yueming Wang and colleagues introduce personalized models that decode human emotion states from intracranial brain recordings in real time.

এই বিষয়ে আরও নিবন্ধ পড়ুন:

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।