যখন প্রচলিত চিকিৎসা বিজ্ঞান তার সক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে যায়, তখন রোগের মূল কারণটি বদলে ফেলাই একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়। লেস্টারশায়ারের ব্রিটিশ কিশোরী অ্যালিসা ট্যাপলির ক্ষেত্রে ঠিক এমনটিই ঘটেছিল, যে ২০২২ সালে বিশ্বের প্রথম মানুষ হিসেবে ডিএনএ বেস এডিটিং (base editing) প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাণরক্ষা করতে সক্ষম হয়। এটি এমন এক আধুনিক প্রযুক্তি যার সাহায্যে ডিএনএর দ্বিসূত্রক কাঠামো না ভেঙেই জেনেটিক কোডের নির্দিষ্ট কিছু ‘অক্ষর’ পরিবর্তন করা যায়।
২০২১ সালের মে মাসে মাত্র তেরো বছর বয়সে অ্যালিসার শরীরে টি-সেল একিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া শনাক্ত হয়, যা রক্ত ক্যান্সারের একটি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ। এর আগে তার বাবা-মা লক্ষ্য করেছিলেন যে সে প্রায়ই সর্দি-কাশি, ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া এবং সারাক্ষণ ক্লান্তিতে ভুগছিল। শুরুতে এগুলো সাধারণ শৈশবকালীন অসুস্থতা মনে হলেও রোগটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং খুব শীঘ্রই কিশোরীটিকে আইসিইউ-তে ভর্তি করতে হয়।
লেস্টার এবং শেফিল্ডের হাসপাতালের চিকিৎসকরা সে সময় প্রচলিত সব ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল নিবিড় কেমোথেরাপি এবং বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই রোগটি আবারও ফিরে আসে। ক্যান্সার পুনরায় ফিরে আসার পর চিকিৎসকরা অ্যালিসার পরিবারকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে তাকে সুস্থ করার মতো আর কোনো কার্যকর পথ অবশিষ্ট নেই এবং এখন কেবল তাকে ব্যথামুক্ত রাখার প্যালিয়েটিভ কেয়ারই দেওয়া সম্ভব।
তবে অ্যালিসার বাবা-মা আশা ছাড়েননি এবং নতুন কোনো সুযোগের সন্ধানে থাকেন। এর মাধ্যমেই তারা লন্ডনের গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হসপিটালে প্রফেসর ওয়াসিম কাসিমের অধীনে পরিচালিত একটি ক্লিনিকাল ট্রায়াল সম্পর্কে জানতে পারেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হেলথের বিজ্ঞানীরা তখন সম্পূর্ণ নতুন একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছিলেন যা আগে কখনও মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয়নি।
এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি ছিল জেনেটিকালি সংশোধিত টি-লিম্ফোসাইট বা এক ধরনের রোগ প্রতিরোধক কোষ, যা টিউমার শনাক্ত করে ধ্বংস করতে সক্ষম। কিন্তু টি-সেল লিউকেমিয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা দেখা দেয়: সাধারণ সংশোধিত কোষগুলো ক্যান্সার কোষ এবং সুস্থ কোষের মধ্যে পার্থক্য করতে না পেরে একে অপরকেই ধ্বংস করতে শুরু করে।
এই সংকটের এক অভাবনীয় সমাধান দেয় ডিএনএ বেস এডিটিং প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির সাহায্যে গবেষকরা দাতা কোষের জেনেটিক কোডে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনেন। প্রচলিত ক্রিস্পার (CRISPR-Cas9) পদ্ধতির মতো এটি ডিএনএর দুই সুতোকে কেটে ফেলে না, বরং রাসায়নিকভাবে একটি নাইট্রোজেন বেসকে অন্যটিতে বদলে দেয়। এর ফলে জিনোমে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের ঝুঁকি অনেক কমে যায় এবং এমন কিছু কোষ তৈরি করা সম্ভব হয় যা সুস্থ টিস্যু বা একে অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে শুধুমাত্র ক্যান্সার কোষগুলোকেই বেছে বেছে ধ্বংস করতে পারে।
২০২২ সালের মে মাসে অ্যালিসাকে গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হসপিটালের বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইউনিটে ভর্তি করা হয়। বিশ্বের প্রথম রোগী হিসেবে সে এই পরীক্ষামূলক জেনেটিক চিকিৎসা গ্রহণ করে।
চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগে অ্যালিসা এমন কিছু কথা বলেছিল যা পরে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে:
“এমনকি এটি যদি আমার কাজে নাও লাগে, তবুও হয়তো অন্য কারও উপকারে আসবে।”
প্রস্তুতিমূলক চিকিৎসার পর চিকিৎসকরা তার শরীরে দাতার শরীর থেকে সংগৃহীত ও জেনেটিকালি সংশোধিত টি-লিম্ফোসাইট প্রবেশ করান। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সেই কোষগুলো তার শরীরে সক্রিয়ভাবে বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে। চার সপ্তাহ পর বোন ম্যারো পরীক্ষায় দেখা যায় সে সম্পূর্ণ ক্যান্সারমুক্ত এবং তার শরীরে ক্যান্সারের কোনো অবশিষ্ট চিহ্ন নেই। এরপর তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য অ্যালিসাকে দ্বিতীয়বার স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয়।
ডিএনএ বেস এডিটিং প্রযুক্তিটি ২০১৬ সালে আমেরিকান বায়োকেমিস্ট ডেভিড লিউ-এর ল্যাবরেটরিতে উদ্ভাবিত হয়েছিল। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এই পদ্ধতিটি মৌলিক গবেষণা থেকে ক্লিনিকাল চিকিৎসায় সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়েছে, যা ডিএনএর গঠন না ভেঙেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিবর্তন আনার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
অ্যালিসার এই সাফল্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এই গবেষণায় অ্যালিসাসহ আরও আটজন শিশু এবং দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক অর্থাৎ মোট ১১ জন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৮২ শতাংশ রোগীই গভীর নিরাময় লাভে সক্ষম হয়েছেন যা তাদের পরবর্তী স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্টের পথ প্রশস্ত করেছে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোগী এখন ক্যান্সারমুক্ত জীবন যাপন করছেন এবং গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রথম দিকের রোগীরা গত তিন বছর ধরে পুনরায় আক্রান্ত হওয়া ছাড়াই সুস্থ আছেন।
আজ অ্যালিসার বয়স ষোলো বছর। সে এখন নিয়মিত পড়াশোনা করছে, ভ্রমণে যাচ্ছে, বন্ধুদের সাথে সময় কাটাচ্ছে এবং বিভিন্ন বিজ্ঞান সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে নিজের জীবনের গল্প শোনাচ্ছে। অথচ কয়েক বছর আগে চিকিৎসকরা তার পরিবারকে সবথেকে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন। আজ সে নিজে একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে যে কীভাবে বিজ্ঞানের আবিষ্কার মানুষের ভাগ্যকে বদলে দিতে পারে।
অ্যালিসার এই কাহিনী কেবল একটি সফল পরীক্ষামূলক চিকিৎসার জয়গান নয়। এটি প্রমাণ করে যে ডিএনএ বেস এডিটিং এখন আর কেবল ল্যাবরেটরির প্রযুক্তি নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে আধুনিক চিকিৎসার একটি বাস্তব হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। যদি পরবর্তী গবেষণাগুলোতে এই পদ্ধতির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এটি কেবল লিউকেমিয়া নয়, বরং রক্ত ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অনেক বংশগত রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
এক সময় জিন থেরাপিকে সুদূরপ্রসারী কোনো সম্ভাবনা মনে করা হতো, কিন্তু আজ তা বাস্তব জীবনে মানুষের প্রাণ বাঁচাচ্ছে। সম্ভবত অ্যালিসার মতো এই গল্পগুলোই চিকিৎসাবিজ্ঞানের সেই নতুন যুগের সূচনা করবে, যেখানে চিকিৎসকরা কেবল রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন না, বরং ডিএনএ স্তরে গিয়ে রোগের মূল কারণটিই নির্মূল করবেন।


