নেদারল্যান্ডসের গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন যা ডিএনএকে ছোট ছোট টুকরো হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘ ও অর্থপূর্ণ খণ্ড হিসেবে পড়তে সক্ষম। এটি বিরল বংশগত রোগ নির্ণয়ের নতুন পথ উন্মোচন করেছে, যা বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসকদের কাছে রহস্য হয়ে ছিল এবং রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
প্রতি দুই হাজার মানুষের মধ্যে একজনেরও কম বিরল জেনেটিক রোগে আক্রান্ত হন, তবে এই ধরনের সাত হাজারেরও বেশি রোগ শনাক্ত করা গেছে এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত। এই রোগগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশই জিনের পরিবর্তনের কারণে ঘটে, কিন্তু বছরের পর বছর কষ্টসাধ্য পরীক্ষার পরও সঠিক রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয় না—চূড়ান্ত উত্তর পাওয়ার আগে অনেক রোগীকে সাত থেকে আটজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়।
নাইমেখেনের র্যাডবাউডইউএমসি (Radboudumc) এবং মাস্ট্রিক্ট ইউএমসি+ (Maastricht UMC+) এর গবেষকরা এক হাজার রোগীর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখিয়েছেন যে, নতুন 'লং-রিড হোল-জিনোম সিকোয়েন্সিং' পদ্ধতি প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় সফল রোগ নির্ণয়ের হার তিন শতাংশ বাড়িয়ে দেয় (১৯.২% বনাম ১৬.৫%)। এছাড়া, একটি মাত্র পরীক্ষা সাধারণত একের পর এক করা ১৫টি আলাদা টেস্টের কাজ সম্পন্ন করতে পারে, যা সময় ও সম্পদ উভয়ই সাশ্রয় করে।
সাধারণ সিকোয়েন্সিং পদ্ধতিতে ডিএনএকে প্রায় ৩০০ 'অক্ষরের' ছোট ছোট টুকরোয় ভাগ করা হয় এবং পরে সেগুলো জোড়া লাগিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরির চেষ্টা করা হয়—এটি অনেকটা পুরো ছবি না দেখে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র টুকরো দিয়ে একটি বিশাল ধাঁধা বা পাজল মেলানোর মতো। নতুন এই প্রযুক্তি একবারে ২০ হাজার একক পর্যন্ত পড়তে পারে, যার ফলে পাজলের বড় অংশগুলো কীভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত হচ্ছে তা সরাসরি দেখা সম্ভব হয়।
এর পাশাপাশি, এই টেস্টটি কেবল জিনের বিন্যাসই নয়, বরং 'এপিজেনেটিক মডিফিকেশন' নামক রাসায়নিক চিহ্নগুলোও শনাক্ত করতে পারে, যা জিনের সক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ করে। আগে এই ধরনের পরিবর্তন শনাক্ত করতে আলাদা জটিল পরীক্ষার প্রয়োজন হতো; এখন একই গবেষণায় দুটি সুবিধা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
নাইমেখেনে আয়োজিত বিশেষ 'আনডায়াগনোজড কেস হ্যাকাথন'-এ নেদারল্যান্ডসের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের প্রায় ১৫০ জন বিশেষজ্ঞ একত্রিত হয়েছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন ৩৩টি পরিবারের রোগ নির্ণয় করা যারা ইতোমধ্যে উপলব্ধ সব ধরনের পরীক্ষা করিয়েছিলেন। ডিএনএ-র পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এবং সম্মিলিত দক্ষতার মাধ্যমে ১৫টি নতুন রোগ শনাক্ত করা হয়েছে যা আগে অজানা ছিল।
গবেষকরা 'নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন'-এ তাদের ফলাফল প্রকাশ করেছেন এবং বিরল জেনেটিক রোগের সন্দেহে প্রাথমিক পরীক্ষা হিসেবে 'লং-রিড সিকোয়েন্সিং' ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন। ট্রান্সলেশনাল জিনোমিক্সের অধ্যাপক লিজেনকা ভিসার্সের মতে, এটি দীর্ঘ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটায়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার সংখ্যা কমায় এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে সহায়তা করে।
তথ্যভাণ্ডার বৃদ্ধির সাথে সাথে মিউটেশন এবং রোগের সম্পর্কের বিষয়ে মানুষের জ্ঞান যত গভীর হবে, এই পরীক্ষার নির্ভুলতা তত বাড়বে। গবেষকদের ধারণা, নতুন আবিষ্কারের আলোকে তথ্যের পুনরায় বিশ্লেষণ করলে রোগ নির্ণয়ের হার আরও ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে—যা শত শত পরিবারের জন্য আশার আলো।
বিরল রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সামনে এখন আরও নিখুঁত এবং মানবিক একটি পথ উন্মোচিত হয়েছে।




