আশার আলো: যেভাবে সামাজিক প্রতিষ্ঠান 'রিলুম' (Relume) শরণার্থীদের স্বাবলম্বী হয়ে নতুন জীবন শুরু করতে সাহায্য করছে

লেখক: Tatyana Hurynovich

আশার আলো: যেভাবে সামাজিক প্রতিষ্ঠান 'রিলুম' (Relume) শরণার্থীদের স্বাবলম্বী হয়ে নতুন জীবন শুরু করতে সাহায্য করছে-1

যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে যখন কাউকে কয়েক দশক রিফিউজি ক্যাম্পে কাটাতে হয়, তখন নতুন কোনো দেশে পাড়ি জমানো মানে স্রেফ ঠিকানা বদল নয়। এর অর্থ হলো একেবারে শূন্য থেকে সবকিছু শুরু করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসা অনেক শরণার্থীর জন্য এই পথটি ভাষাগত বাধা, স্থানীয় পরিচিতির অভাব এবং বিমান টিকিটের ঋণের চাপে আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তবে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের অলিম্পিয়া শহরে Relume নামক এক অনন্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা এই মানুষদের পরিবেশবান্ধব মোমবাতি তৈরির মাধ্যমে কেবল টিকে থাকতেই নয়, বরং নতুন করে জীবন গড়ে তুলতেও সাহায্য করছে।

অদৃশ্য বাধাগুলো অতিক্রম করা

যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর শরণার্থীরা প্রায়ই এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হন: তাদের কাছ থেকে আশা করা হয় যে সফরের জন্য নেওয়া বিমান টিকিটের ঋণ তারা দ্রুত শোধ করবেন। কিন্তু নিয়োগকর্তারা যখন অনর্গল ইংরেজি বলা, আমেরিকায় কাজের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় রেফারেন্সের দাবি করেন, তখন সেই অর্থ উপার্জন করা কীভাবে সম্ভব?

এই সমস্যার সমাধানেই এগিয়ে আসেন Relume-এর প্রতিষ্ঠাতা দুই বন্ধু—র্যান্ড রোডেল (Rand Roedell) এবং কারিমা বাসলে (Karima Bassalé)। তারা লক্ষ্য করেন যে প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট অঞ্চলে অনেক শরণার্থী কাজের জন্য মরিয়া হয়ে আছেন এবং স্বাবলম্বী হতে চান, কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও ভাষাগত বাধার কারণে তাদের আবেদনগুলো বারবার বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

মোমবাতি তৈরির এই শিল্পটি এই জটিল সমস্যার একটি চমৎকার ও বাস্তবসম্মত সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কাজটি হাতে-কলমে কর্মক্ষেত্রেই শেখানো যায়; এর জন্য অনর্গল ইংরেজি বলা বা কোনো প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন নেই। এটি মানুষকে উপার্জনের সুযোগ করে দিচ্ছে এবং পাশাপাশি তাদের নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করছে।

যারা আলো জ্বালান, তাদের গল্প

Relume-এর অনেক কর্মীর কাছে এই কাজটি হয়ে উঠেছে জীবনের এক সত্যিকারের লাইফলাইন।

মাগুনো ২০২৩ সালে তার দুই প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের সাথে অলিম্পিয়াতে আসেন। এর আগে তিনি কঙ্গোর যুদ্ধ থেকে বাঁচতে পালিয়ে তানজানিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে দীর্ঘ ৩০ বছর কাটিয়েছেন। তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে আসার বিমান টিকিটের ঋণ যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধ করা। Relume-এর বেতন দিয়ে তিনি সেই ঋণ শোধ করতে পেরেছেন। মাগুনোর কাছে এটি কেবল একটি আর্থিক লেনদেন ছিল না, বরং তার স্বনির্ভরতার প্রমাণ ছিল। “এই ঋণ পরিশোধ করা আমার জন্য একটি সম্মানের বিষয় ছিল, আমাকে যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে তার প্রতিদান দেওয়ার একটি পথ,” বলেন তিনি।

আরেকজন কর্মী এইমান, যার জন্ম সিরিয়ায়। যখন তার বয়স মাত্র ১০ বছর, যুদ্ধের কারণে তাকে পরিবারের সাথে জর্ডানে পালিয়ে যেতে হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি তার স্বামী তারেক এবং দুই ছোট ছেলেকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন, যেখানে প্রথম দিকে দৈনন্দিন কাজগুলোও তার কাছে পাহাড়সম কঠিন মনে হতো। কিন্তু কর্মশালার কাজে যোগ দেওয়ার পর দ্রুতই সব বদলে যেতে শুরু করে। “নিজের ওপর আস্থা রাখা, মানুষের সাথে আরও বেশি মেলামেশা করা, ভাষাকে আরও ভালোভাবে বোঝা এবং অর্থ উপার্জন করা—এই সবকিছুই আমাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে,” বলেন এইমান।

স্রেফ একটি কর্মস্থলের চেয়েও বেশি কিছু

Relume কেবল একটি কর্মশালা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সম্প্রদায়। কর্মীরা যখন মোমবাতি তৈরির কাজ করেন, তখন স্বেচ্ছাসেবীরা সেখানে এসে তাদের ইংরেজি শেখান। উল্লেখ্য যে, এই পড়াশোনার সময়ের জন্য শরণার্থীদের আলাদাভাবে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।

এছাড়া, পরিবারগুলো নিয়মিতভাবে একসাথে নৈশভোজে মিলিত হয়। কারিমা বাসলের মতে, এটি প্রতিষ্ঠানটিকে কেবল একটি 'সাময়িক ব্যবস্থা' থেকে সত্যিকারের একটি আশ্রয়ে পরিণত করেছে। “পুরো দল এই মোমবাতি তৈরির কারখানার প্রতি দায়িত্ববোধ অনুভব করে, Relume-এর এই বড় পরিবারের সাথে তাদের একাত্মতা তৈরি হয়েছে,” তিনি উল্লেখ করেন।

আগামীর সেতুবন্ধন

Relume-এর প্রতিষ্ঠাতারা তাদের লক্ষ্যকে কেবল সাময়িক কর্মসংস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তারা চান তাদের এই উদ্যোগটি যেন মার্কিন শ্রমবাজারে শরণার্থীদের পরবর্তী ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য সিঁড়ি হয়ে ওঠে।

“আমরা একদিন তাদের জন্য পেশাদার রেফারেন্স হিসেবে কাজ করতে চাই, যখন তারা Relume ছাড়িয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে,” বলেন প্রতিষ্ঠাতারা।

Relume-এর এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে কেবল দয়ার দানের চেয়ে কাজের মর্যাদা ও সুযোগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অলিম্পিয়ার এই কর্মশালায় মোমবাতি জ্বালানোর মাধ্যমে কঙ্গো, সিরিয়া এবং অন্যান্য দেশ থেকে আসা শরণার্থীরা কেবল একটি পণ্য তৈরি করছেন না—তারা ধাপে ধাপে তাদের জীবন পুনর্গঠন করছেন, খুঁজে পাচ্ছেন আত্মসম্মান, স্বাধীনতা এবং একটি নতুন ঠিকানা।

বর্তমানে Relume অলিম্পিয়া থেকে ৪০টি অঙ্গরাজ্যে মোমবাতি পাঠাচ্ছে। এই বিপুল চাহিদা প্রমাণ করে: আধুনিক ক্রেতারা এমন উদ্যোগকেই সমর্থন করছেন যেখানে মানবিক মূল্যবোধ জড়িয়ে আছে এবং যেখানে প্রতিটি কর্মীর অবদানকে মূল্যায়ন করা হয়, তবে শর্ত একটাই—পণ্যটি হতে হবে মানসম্মত ও প্রতিযোগিতামূলক।

14 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • How the ancient art of candle making is creating a brighter future for refugees

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।