ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অর্থনৈতিক ও আর্থিক বিষয়ক কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ডিজিটাল ইউরো চালুর অনুমোদন দিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সার্বভৌমত্ব জোরদার এবং মার্কিন পেমেন্ট অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৯ সালের মধ্যে এই নতুন ডিজিটাল মুদ্রা বাজারে আসবে।
মার্কিন জায়ান্টদের একাধিপত্য
ইউরোজোনের জন্য সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (সিবিডিসি) তৈরির এই উদ্যোগ মূলত ইউরোপের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার প্রয়োজন থেকে নেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) তথ্যমতে, ইউরোজোনে কার্ডের মাধ্যমে হওয়া মোট লেনদেনের ৬১ শতাংশই পরিচালিত হয় মার্কিন পেমেন্ট জায়ান্ট ভিসা এবং মাস্টারকার্ডের মাধ্যমে। তদুপরি, এই কোম্পানিগুলো ওই অঞ্চলের প্রায় সব আন্তঃসীমান্ত কার্ড লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে।
বিদেশি পেমেন্ট অবকাঠামোর ওপর ব্লকের নির্ভরশীলতা থেকে উদ্ভূত ঝুঁকির কারণে আর্থিক সার্বভৌমত্বের আলোচনা ব্যাপক গতি পেয়েছে। ডিজিটাল ইউরোকে ইউরোপীয় বাজার সুরক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডিজিটাল ইউরো যেভাবে কাজ করবে
ডিজিটাল ইউরো হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থের একটি ডিজিটাল রূপ, যা ইসিবি কর্তৃক ইস্যু এবং সমর্থিত হবে। তবে ব্রাসেলস জোর দিয়ে বলেছে যে, এই নতুন মুদ্রা নগদ টাকা বা প্রচলিত ব্যাংকিং পরিষেবার বিকল্প হবে না, বরং সেগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
নাগরিকরা একটি বিশেষ ওয়ালেটে ডিজিটাল ইউরো জমা রাখতে পারবেন, তবে জমানোর পরিমাণের ওপর একটি সীমা নির্ধারণ করা হবে (যার সঠিক পরিমাণ এখনও ঠিক করা হয়নি)। এই ব্যবস্থায় অনলাইন এবং অফলাইন উভয় ধরনের পেমেন্টই করা যাবে। গোপনীয়তার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; ইসিবি পেমেন্ট তথ্যে সরাসরি প্রবেশাধিকার পাবে না, ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে ব্যবহারকারীদের সরাসরি শনাক্ত করা সম্ভব হবে না।
অবকাঠামো এবং কমিশন
ইসিবি মূলত মৌলিক প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরির দায়িত্ব নেবে। তবে সাধারণ নাগরিক এবং ব্যবসার জন্য সরাসরি পরিষেবার কাজগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক ও পেমেন্ট কোম্পানিগুলো পরিচালনা করবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পারিশ্রমিক পাবে এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেনদেনের জন্য কমিশন দিতে হবে, যা ভিসা ও মাস্টারকার্ডের বর্তমান হারের চেয়ে কম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আলোচনার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে আলোচনার আগে এই পারিশ্রমিক নির্ধারণের পদ্ধতিটিই অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
বাজার ও রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া
ইসিবি ইতোমধ্যেই কমিটির এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির প্রেস সার্ভিস জানিয়েছে, "আমরা কমিটির এই অবস্থানকে স্বাগত জানাই, কারণ এটি নগদ ইউরোকে আইনি লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি ডিজিটাল ইউরোর জন্য একটি কাঠামো তৈরি করবে।"
ইতালীয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য পাসকুয়ালে ত্ৰিদিকো, যিনি 'লেফট' ফ্র্যাকশনের পক্ষে এই নথির আলোচনা পরিচালনা করেছিলেন, এই ভোটকে "ঐতিহাসিক" বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, "ডিজিটাল ইউরো রেগুলেশনের অনুমোদন সাধারণ নাগরিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এক বড় জয়।"
বিশ্বজুড়ে সিবিডিসি প্রতিযোগিতা ও আমেরিকার বিকল্প পথ
সরকারি ডিজিটাল মুদ্রা তৈরির দৌড়ে ইউরোপ একা নয়। চীন ইতিমধ্যেই ডিজিটাল ইউয়ান চালু করেছে এবং রাশিয়া ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিজিটাল রুবল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মৌলিকভাবে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেড কর্তৃক ইস্যুকৃত ডিজিটাল ডলারের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং পরিবর্তে বেসরকারি স্ট্যাবলকয়েন উন্নয়নের ওপর বাজি ধরেছেন। যেহেতু এই ধরনের বেশিরভাগ ক্রিপ্টো সম্পদ ডলারে অভিহিত, তাই এর সমর্থকরা মনে করেন এটি আন্তঃসীমান্ত পেমেন্টে মার্কিন মুদ্রার আন্তর্জাতিক ভূমিকা আরও শক্তিশালী করবে।
তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে সিবিডিসি প্রসঙ্গটি আবার ফিরে আসতে পারে। কমোডিটি ফিউচার ট্রেডিং কমিশনের (সিএফটিসি) সাবেক চেয়ারম্যান টিমোথি মাসাদ কয়েনডেস্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াশিংটনে এ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ডিজিটাল ডলার সময়ের সাথে অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
এখন অর্থনৈতিক ও আর্থিক বিষয়ক কমিটির এই অবস্থান জুলাইয়ের শুরুতে স্ট্রাসবার্গে পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হতে হবে। এরপর ইইউ-এর ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের সাথে আলোচনা শুরু হবে। সংসদ সদস্যরা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা করছেন, যাতে ২০২৯ সালের মধ্যে এই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়।



