প্যারিসের প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে বিউরির একটি প্রাচীন মেগালিথিক সমাধিতে গবেষকরা একটি নাটকীয় রূপান্তরের কাহিনী উন্মোচন করেছেন। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন যুগে সেখানে সমাহিত ১৩২ জনের জেনেটিক বিশ্লেষণে একটি বিস্ময়কর তথ্য বেরিয়ে এসেছে: খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের দিকে স্থানীয় জনসংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায় এবং পরবর্তীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জনগোষ্ঠী তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়।
"আমরা এই দুই সময়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট জেনেটিক ব্যবধান লক্ষ্য করছি," মন্তব্য করেছেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক ফ্রেডরিক ভ্যালিউর সিয়ারশলম। সমাহিত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পার্থক্যটি কেবল সাংস্কৃতিক ছিল না, বরং তাদের মধ্যে কোনো জেনেটিক সামঞ্জস্যই ছিল না, যা একটি বিশাল জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রমাণ দেয়।
প্রথম দিকের সমাধিগুলো (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০-৩১০০ অব্দ) উত্তর ফ্রান্স ও জার্মানির প্রস্তর যুগের কৃষক সম্প্রদায়ের ছিল। সেখানে সমাহিত ব্যক্তিরা বড় পারিবারিক গোষ্ঠী গঠন করত, যেখানে একই পরিবারের কয়েক প্রজন্মের সদস্যরা পাশাপাশি শায়িত ছিলেন। পরবর্তী যুগের সমাধিগুলোতে সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনগত বৈশিষ্ট্যের মানুষ পাওয়া যায়, যাদের সাথে দক্ষিণ ফ্রান্স ও আইবেরীয় উপদ্বীপের জোরালো সম্পর্ক ছিল। এই দুই ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো নিকট আত্মীয়তার প্রমাণ মেলেনি।
এই সংকটের পেছনে আসল কারণ কী ছিল? দাঁত থেকে উদ্ধারকৃত প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণে বেশ কিছু রোগের সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষকরা চারজনের অবশিষ্টাংশে প্লেগ (ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস) এবং দুইজনের মধ্যে উকুনের মাধ্যমে ছড়ানো রিল্যাপসিং ফিভারের (বোরেলিয়া রিকারেন্টিস) অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। তবে বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, কেবল রোগই এর একমাত্র বা প্রধান কারণ ছিল না। সম্ভবত এলাকাটি একের পর এক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল—সংক্রমণ, পরিবেশগত চাপ এবং অন্যান্য দুর্যোগের সম্মিলিত প্রভাবে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
জনতাত্ত্বিক চিত্রটি বিপর্যয়ের বিশালতা প্রকাশ করে। প্রথম যুগের সমাধিগুলোর সময় মৃত্যুহার অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল, বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের মধ্যে। ফরাসি জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রের (CNRS) গবেষণা পরিচালক ও বিউরি প্রকল্পের প্রধান লরা সালানোভা বলেন, "একটি স্বাভাবিক ও সুস্থ জনসংখ্যার ক্ষেত্রে আমরা এমন মৃত্যুহার প্রত্যাশা করি না।" তিনি আরও যোগ করেন, "এটি কোনো বড় বিপর্যয়—যেমন রোগ, দুর্ভিক্ষ বা সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়।" পাশাপাশি পরিবেশগত তথ্য থেকে দেখা যায় যে, পরিত্যক্ত ফসলি জমিতে বনভূমি পুনরায় ফিরে আসতে শুরু করেছিল, যা কৃষি কাজ আকস্মিকভাবে বন্ধ হওয়ার লক্ষণ।
এই জনতাত্ত্বিক পতনের সাথে সাথে সামাজিক কাঠামোও পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে এই সমাধিটি ছিল সুসংগঠিত বিশাল পরিবারের মিলনস্থল, যা সামাজিক ঐক্য এবং পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে। পরবর্তীতে যখন নতুন জনগোষ্ঠী ফিরে আসে, তখন সমাধি প্রদান বিরল হয়ে পড়ে এবং তা কেবল একটি পুরুষতান্ত্রিক ধারাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এটি কেবল রীতিনীতির বদল ছিল না, বরং এটি ছিল সমাজের মৌলিক কাঠামোরই পরিবর্তন।
আরও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই বিপর্যয় পুরো ইউরোপ জুড়ে মেগালিথিক যুগের অবসানের সাথে হুবহু মিলে যায়। বিশাল পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ—যেমন ডলমেন, গ্যালারি এবং অন্যান্য মনুমেন্ট নির্মাণ ঠিক তখনই বন্ধ হয়ে যায় যখন নির্মাতা জনগোষ্ঠী অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। নতুন আসা গোষ্ঠীগুলো তাদের স্থান দখল করলেও তারা আর পাথর দিয়ে বিশাল কিছু তৈরি করেনি। এই আবিষ্কারটি ইউরোপীয় প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাসের দীর্ঘতম রহস্যগুলোর একটির সমাধান দিতে শুরু করেছে।
এই ধরণের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন কি মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিওলিথিক যুগের অন্যান্য রহস্যগুলোকেও ব্যাখ্যা করতে পারবে? ফরাসি জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র (CNRS) এবং কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন (Nature Ecology & Evolution) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, উত্তরটি ইতিবাচক।




