২০২৩ সালের অক্টোবরে নাসার আর্টেমিস থ্রি মিশনের জন্য অত্যাধুনিক স্পেসস্যুট তৈরিতে ইতালীয় ফ্যাশন হাউস প্রাদা এবং মার্কিন অ্যারোস্পেস কোম্পানি অ্যাক্সিওম স্পেসের অংশীদারিত্বের কথা জানানো হয়, যা ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরের পর প্রথম মানববাহী চন্দ্রাভিযান হতে যাচ্ছে। এই যৌথ প্রচেষ্টার ফসল হলো 'অ্যাক্সিওম এক্সট্রাভেহিকুলার মবিলিটি ইউনিট' (AxEMU)—বিগত ২০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে যা নাসার মহাকাশচারীদের পোশাকের ক্ষেত্রে প্রথম বড় ধরনের আধুনিকায়ন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এই AxEMU স্পেসস্যুটের চূড়ান্ত নকশা সর্বসমক্ষে উন্মোচন করা হয়।
২০২৬ সালের ৭ জুন অ্যাক্সিওম স্পেস এবং প্রাদা আনুষ্ঠানিকভাবে সেই বিশেষ অংশটি প্রদর্শন করে যা মূলত ফ্যাশন হাউসটির নিজস্ব কারিগরি দক্ষতায় তৈরি—আর তা হলো 'লিকুইড কুলিং অ্যান্ড ভেন্টিলেশন গার্মেন্ট' (LCVG)। এটি মহাকাশচারীদের শরীরের সাথে লেগে থাকা একটি অভ্যন্তরীণ শীতলীকরণ এবং বায়ুচলাচলকারী পোশাক, যা তারা মূল AxEMU স্যুটের নিচে পরিধান করবেন। প্রাদার প্রকৌশলী ও ডিজাইনাররা এই পোশাকে যেসব বিষয় যুক্ত করেছেন তা হলো:
- ১. তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা: পোশাকটিতে রয়েছে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা টিউব, যার মাধ্যমে মহাকাশচারীর শরীরের চারপাশে ঠান্ডা পানি প্রবাহিত হয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
- ২. বায়ুচলাচল ব্যবস্থা: এটি মহাকাশচারীর পোশাকের ভেতরে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দিতে সাহায্য করে।
- ৩. উন্নত কাঁচামাল: প্রাদা তাদের নিটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, অত্যাধুনিক উপকরণ এবং উদ্ভাবনী নকশার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লাগিয়েছে।
- ৪. থ্রিডি মডেলিং: নিখুঁত মাপ এবং আরাম নিশ্চিত করতে উন্নত থ্রিডি মডেলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিভিন্ন শারীরিক গঠনের মহাকাশচারীদের সাথে মানিয়ে যায়।
- ৫. শৈল্পিক ছোঁয়া: একটি আস্তিনে প্রাদার 'অ্যাক্টিভওয়্যার' লাইনের পরিচিত লাল স্ট্রাইপটি যোগ করা হয়েছে, যা পোশাকটিকে নান্দনিক মাত্রা দান করেছে।
কেন এই নাসা প্রকল্পে একটি ফ্যাশন হাউসকে যুক্ত করা হলো? প্রাদাকে বিশেষ সহযোগী হিসেবে বেছে নিয়েছে ব্যক্তিগত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সিওম স্পেস, কারণ তারা প্রথাগত মহাকাশ শিল্পের বাইরে ভিন্ন কোনো দক্ষতা খুঁজছিল। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে কাজ করার প্রধান যুক্তিগুলো হলো:
- প্রাদা কয়েক দশক ধরে এমন হাই-পারফরম্যান্স কাপড় নিয়ে কাজ করছে যা চরম প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে সক্ষম।
- ইঞ্জিনিয়ারড নিটওয়্যারের ক্ষেত্রে প্রাদার অনন্য কারিগরি জ্ঞান রয়েছে, যা বিশেষ গুণসম্পন্ন টেক্সটাইল কাঠামো তৈরিতে সহায়ক।
- ফ্যাশন জগতে প্রাদার 'বিস্পোক ফিট' বা ব্যক্তিগত মাপের পোশাক তৈরির অভিজ্ঞতা মহাকাশচারীদের দীর্ঘক্ষণ পোশাক পরে থাকার স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করে।
- প্রাদা এমন অল্প কিছু ফ্যাশন হাউসের একটি, যারা কেবল নকশায় নয় বরং গবেষণাগারে (R&D) টেকসই উপকরণের উদ্ভাবনে নিয়মিত বিনিয়োগ করে।
- প্রাদার উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি প্রতিটি সেলাই এবং টিউবের নিখুঁত সংযোগ নিশ্চিত করে, যা LCVG পোশাকের বায়ুরোধী ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
নাসার প্রথাগত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন কলিন্স অ্যারোস্পেস, আইএলসি ডোভার) স্পেসস্যুট তৈরির বিশাল অভিজ্ঞতা থাকলেও অ্যাক্সিওম স্পেস চেয়েছিল এর স্বাচ্ছন্দ্য ও ব্যবহারের সুবিধায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে। আগের স্পেসস্যুটগুলোর প্রধান সমস্যা ছিল নড়াচড়ায় অসুবিধা এবং অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া। প্রাদা যেহেতু কয়েক দশক ধরে 'চলাচলের সময় পোশাক কীভাবে শরীরের জন্য আরামদায়ক করা যায়' তা নিয়ে কাজ করছে এবং তাদের নকশা ও আধুনিক উপকরণের সমন্বয়ে দক্ষতা বাড়িয়েছে, তাই তারা সেই অভিজ্ঞতাই এখানে কাজে লাগিয়েছে।
বর্তমানে এই মিশন সম্পর্কিত যেকোনো খবর বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রচার পায়। আর প্রাদা এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাথে নিজেদের ব্র্যান্ডকে যুক্ত করেছে। LCVG-এর মতো একটি উপকরণ ইন্সটাগ্রামে প্রদর্শনের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। এটি দেখতে অনেকটা উচ্চপ্রযুক্তি সম্পন্ন স্পোর্টস গিয়ারের মতো, যা প্রাদার শৈলী এবং তাদের অনুসারীদের পছন্দের সাথে মিলে যায়।
সাময়িক বিপণন সুবিধার বাইরেও এই প্রকল্পটি প্রাদাকে কেবল ফ্যাশন জগতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি প্রযুক্তি-নির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি দিচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে আরও বড় বড় প্রজেক্টের পথ খুলে দিচ্ছে। মহাকাশ শিল্পে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের পর এখন প্রাদা অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সাথে স্পোর্টস গিয়ার, চিকিৎসা সরঞ্জাম বা চরম আবহাওয়ায় সুরক্ষা পোশাক তৈরিতেও কাজ করার সুযোগ পাবে।
এই অংশীদারিত্ব কেবল একটি স্পেসস্যুট তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিভিন্ন শিল্পের মধ্যকার বাধা ভেঙে দেওয়ার প্রতীক। মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এই প্রথম ফ্যাশন জগতের অভিজ্ঞতাকে প্রকৌশল সমস্যার সমাধানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হলো। প্রাদা প্রমাণ করেছে যে উন্নত কাপড় ও আরামদায়ক নকশার দীর্ঘদিনের চর্চা মহাকাশ শিল্পের জটিল চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করতে পারে। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি খাতের মধ্যে ভবিষ্যতের সহযোগিতার নতুন পথ উন্মোচন করল।
সবশেষে এই বিষয়টি বেশ প্রতীকী যে, প্রথম নারী এবং প্রথম অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি যখন চাঁদে পা রাখবেন, তখন তাদের গায়ে থাকবে ইতালীয় ফ্যাশন হাউসের ছোঁয়ায় তৈরি পোশাক। এটি প্রমাণ করে যে একবিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলো আলাদাভাবে নয়, বরং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হয়।



