মহাকাশের গভীর থেকে আসা এক পরিযায়ী: ৩আই/অ্যাটলাস ধূমকেতু সম্পর্কে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ যা জানাল

লেখক: Uliana S

৩I/ATLAS-এর গঠনসংক্ষেপ তথ্য দেখায় যে এটি খুব ঠাণ্ডা একটি নক্ষত্র-সিস্টেমে গড়ে উঠতে পারে এবং আমাদের গ্যাল্যাক্সির ইতিহাসে খুব আগে সময়ে ঘটেছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতু ৩আই/অ্যাটলাস (3I/ATLAS) সূর্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার সময় ধীরে ধীরে ম্লান হতে শুরু করে। ঠিক সেই মুহূর্তে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এক অনন্য সুযোগ কাজে লাগান এবং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সবচেয়ে শক্তিশালী যন্ত্র, এনআইআরস্পেক (NIRSpec) স্পেকট্রোমিটারটি এর দিকে তাক করেন। সূর্যের তাপে সদ্য উত্তপ্ত হওয়া ধূমকেতুটি মহাকাশে প্রাচীন বরফ থেকে তৈরি গ্যাসের এক বিশাল মেঘ নিঃসরণ করছিল, যা রাসায়নিক বিশ্লেষণের জন্য বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল এক আদর্শ উপাদান।

ইন্টারস্টেলার অবজেক্ট 3I/ATLAS-এর অদ্ভুত আইসটোপিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে আমাদের নিজস্ব সোলার সিস্টেমের কমেটগুলোর সঙ্গে তুলনা করে দেখায় ইনফোগ্রাফিক।

২০২৬ সালের ২২ জুন নেচার (Nature) সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞানীদের রীতিমতো বিস্মিত করেছে। ৩আই/অ্যাটলাস-এর রাসায়নিক গঠন আমাদের সৌরজগতের ধূমকেতুগুলোর তুলনায় নাটকীয়ভাবে আলাদা। বিশেষ করে এতে ডিউটেরিয়াম বা ভারী হাইড্রোজেনের পরিমাণ আমাদের পরিচিত বস্তুগুলোর তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। এছাড়া, কার্বন-১২-এর তুলনায় কার্বন-১৩ আইসোটোপের উপস্থিতি এখানে অত্যন্ত নগণ্য।

এই সংগৃহীত তথ্যগুলো বিজ্ঞানীদের মহাবিশ্বের সুদূর অতীতে উঁকি দেওয়ার এক বিরল সুযোগ করে দিয়েছে। গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, এই ধূমকেতুটি প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন বছর আগে গঠিত হয়েছিল। এটি ছিল মহাবিশ্বের সেই সময় যখন নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়া ছিল তুঙ্গে, যাকে বিজ্ঞানীরা 'কসমিক নুন' বলে অভিহিত করেন। সম্ভবত এটি অন্য কোনো নক্ষত্র ব্যবস্থার অত্যন্ত শীতল ও ঘন আণবিক মেঘের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল, যেখানে বরফ কোটি কোটি বছর ধরে হিমায়িত অবস্থায় ছিল এবং তাপের সংস্পর্শে আসেনি।

পরবর্তীতে কোনো এক মহাজাগতিক ঘটনায় ধূমকেতুটি তার নিজস্ব নক্ষত্র ব্যবস্থা থেকে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে ছিটকে পড়ে। দীর্ঘ বিলিয়ন বছর পথ পাড়ি দেওয়ার পর এটি ঘটনাক্রমে আমাদের সৌরজগতে প্রবেশ করে। নাসা-র (NASA) গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের অ্যাস্ট্রোকেমিস্ট এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক মার্টিন কর্ডিনার উল্লেখ করেছেন যে, এটি অন্য নক্ষত্র ব্যবস্থা থেকে আসা এমন আদিম উপাদান নিয়ে গবেষণার এক অভাবনীয় সুযোগ, যা সম্ভবত আমাদের সূর্যের চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন। এই পর্যবেক্ষণগুলো আমাদের নিজস্ব গ্রহ ব্যবস্থার পরিবেশ কতটা সাধারণ বা অনন্য তা বুঝতে বিশেষভাবে সাহায্য করে।

আইসোটোপিক অনুপাতের তুলনামূলক বিশ্লেষণগুলো একটি স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে। আমাদের সৌরজগত মহাবিশ্বের ইতিহাসে অনেক পরে গঠিত হয়েছিল, যখন পূর্ববর্তী প্রজন্মের নক্ষত্রগুলো মহাকাশকে ভারী আইসোটোপ দিয়ে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। কিন্তু ৩আই/অ্যাটলাস ধূমকেতুটি আদি গ্যালাক্সির সেই 'আদিম' রাসায়নিক ছাপ এখনও নিজের মধ্যে নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছে, যা বিজ্ঞানীদের জন্য এক অমূল্য বৈজ্ঞানিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের কাছে এই গবেষণা কেবল মহাকাশীয় প্রত্নতত্ত্ব নয়, বরং এর গুরুত্ব আরও গভীর। গবেষণার সহ-লেখক স্টেফানি মিলাম জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই ধরনের আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু বিশ্লেষণ আমাদের প্রিবায়োটিক রসায়ন এবং মহাবিশ্বে প্রাণের উৎপত্তির পরিবেশ কতটা বিস্তৃত তা বুঝতে সাহায্য করে। আমরা এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র পৃথিবীতেই প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছি। ৩আই/অ্যাটলাস-এর মতো প্রতিটি অতিথি আমাদের প্রাণের 'রেসিপি' কতটা অনন্য বা সাধারণ তা মূল্যায়নের সুযোগ দেয়।

বর্তমানে ৩আই/অ্যাটলাস সূর্য থেকে অনেক দূরে তার অন্তহীন যাত্রা অব্যাহত রেখেছে এবং বিজ্ঞানীরা এর থেকে প্রাপ্ত জটিল বর্ণালীগুলো বিশ্লেষণ করে চলেছেন। এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত মাত্র তৃতীয় নিশ্চিত আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা অন্য একটি নক্ষত্র ব্যবস্থার এক প্রাচীন খণ্ডের সাথে যেন সরাসরি সংলাপে লিপ্ত হতে পেরেছি। এই বৈজ্ঞানিক আলাপচারিতা গ্যালাক্সির বিশাল প্রেক্ষাপটে আমাদের সৌরজগতের অবস্থান এবং এর অনন্যতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকে আমূল বদলে দিচ্ছে।

11 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।