রাতের নিবিড় অন্ধকারে মোজাম্বিকের মাটির রাস্তা দিয়ে ছয়টি ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ির একটি বহর ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। প্রতিটি গাড়িতে আধা-ঘুমন্ত চিতাদের বহনকারী দুই-তিনটি করে খাঁচা ছিল। এভাবেই শুরু হয়েছিল বন্যবিড়াল প্রজাতির এই প্রাণীদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্থানান্তর প্রক্রিয়া: ৫৩ ঘণ্টায় প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে ১২টি চিতাকে।

বড় আকারের বন্যবিড়ালদের মধ্যে চিতারা সবচেয়ে বেশি বিপন্ন। সারা বিশ্বে এখন ৭১০০-এরও কম চিতা টিকে আছে, আর এদের প্রতিবার স্থানান্তরের সময় মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। তা সত্ত্বেও, প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরণের অভিযান পরিচালনা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সংরক্ষণবাদীরা বেশ কয়েক বছর ধরেই চিতাদের তাদের আদি আবাসে ফিরিয়ে নিতে এবং বংশবৃদ্ধির সুযোগ করে দিতে স্থানান্তরের এই পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।

২০২৫ সালের বসন্তে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়: দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ১৬টি চিতাকে পশ্চিম মোজাম্বিকের পানিয়ামে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে ইতিপূর্বেই একটি ‘রহস্যময়’ চিতার পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল এবং বেষ্টনীহীন দুই লক্ষ হেক্টর জমি এদের শিকার ও বংশবৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত জায়গার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল। কিন্তু যাত্রার ঠিক দুই দিন আগে প্রবল বর্ষণে একমাত্র উপযুক্ত রানওয়েটি বন্ধ হয়ে যায়, ফলে স্বল্প সময়ের আকাশপথের পরিবর্তে শুরু হয় এক ক্লান্তিকর সড়কযাত্রা।

প্রথম ধাপ ছিল চেতনানাশক প্রয়োগ। পশু চিকিৎসকরা সেই বিশেষ ঘেরাও করা স্থানে কাজ শুরু করেন যেখানে প্রাণীরা প্রায় এক বছর অতিবাহিত করেছিল। ইনজেকশনের ধকল, প্রচণ্ড গরম আর বাতাসের স্বল্পতা—প্রতিটি ধাপেই ছিল নিখুঁত সতর্কতার প্রয়োজন। এমব্রায়ার বিমানে মেঝের ওপর কালো প্লাস্টিক বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং আকাশপথেই চিতার মূত্রের ‘মিষ্টি ও কটু’ গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর তাদের অফ-রোড গাড়িতে তোলা হয় এবং ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে ঘণ্টায় মাত্র ১৬ কিলোমিটার বেগে ধীরগতিতে যাত্রা শুরু হয়।

অভিযানের ৩৬তম ঘণ্টায় একটি দুর্ঘটনা ঘটে: একটি ল্যান্ড ক্রুজার অন্যটিকে ধাক্কা দেয়। গাড়ির রেডিয়েটর ফেটে পানি বের হতে থাকলেও চিতাদের খাঁচাগুলো অক্ষত ছিল। পরবর্তীতে কুমিরের আনাগোনাপূর্ণ জাম্বেজি নদী দুইবার নৌকায় করে পার হতে হয়েছিল। অসহ্য গরম আর প্রায় এক দিন অভুক্ত থাকা দলের সদস্যদের ক্লান্তি—সব মিলিয়ে এই অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহ পর ‘কাজি’ নামের একটি মা চিতা তিনটি বাচ্চার জন্ম দেয়, যা নতুন এই পপুলেশনের প্রথম সাফল্য। এটি আপাতত একমাত্র দৃশ্যমান সফলতা হলেও এর প্রকৃত ফলাফল বুঝতে আরও কয়েক দশক সময় লাগবে।

এ ধরণের অভিযানগুলো রক্ষা এবং বিলুপ্তির মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম ব্যবধানটি স্পষ্ট করে দেয়। সেই সাথে মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের নিরবচ্ছিন্ন এবং ক্ষেত্রবিশেষে হাড়ভাঙা পরিশ্রম ছাড়া এই পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে বিরল প্রজাতির প্রাণীদের টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।




