এআই লভ্যাংশ: একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সাহসী সামাজিক পরীক্ষার দ্বারপ্রান্তে দক্ষিণ কোরিয়া

লেখক: Aleksandr Lytviak

এআই লভ্যাংশ: একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সাহসী সামাজিক পরীক্ষার দ্বারপ্রান্তে দক্ষিণ কোরিয়া-1

দক্ষিণ কোরিয়া, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যার অর্থনৈতিক উত্থান 'হান নদীর অলৌকিক ঘটনা' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল, তারা এখন এক নতুন উল্লম্ফনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবার এই যাত্রা শুরু হচ্ছে অ্যালগরিদমের যুগে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষে। সিউলে বর্তমানে 'এআই লভ্যাংশ' বা 'এআই ডিভিডেন্ড' ধারণাটি নিয়ে গুরুত্বের সাথে আলোচনা চলছে: এটি এমন এক ধারণা যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে প্রাপ্ত মুনাফা কেবল বড় কর্পোরেশনগুলোর নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের প্রাপ্য হওয়া উচিত।

কেন কোরিয়াকে বেছে নেওয়া হলো?

প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া এখন 'সম্মুখ সারির' দেশ। এখানে স্যামসাং এবং এসকে হাইনিক্সের মতো জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অবস্থিত, যারা এআই কম্পিউটিংয়ের জন্য বৈশ্বিক মেমরি চিপ বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। তবে এই নেতৃত্বের একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে রোবটাইজেশনের ঘনত্বের দিক থেকে (প্রতি ১০,০০০ শ্রমিকের বিপরীতে রোবটের সংখ্যা) বিশ্বে প্রথম স্থানে থাকলেও, জন্মহারের দিক থেকে রয়েছে সবার নিচে।

সরকার এবং সমাজ উভয়ই উপলব্ধি করছে যে: যদি যন্ত্র মানুষের জায়গা দখল করে নেয় এবং সমস্ত মুনাফা কেবল 'চেবল' (পারিবারিক মালিকানাধীন বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী) গুলোর পকেটে চলে যায়, তবে সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

জনগণের কণ্ঠস্বর: যখন চিপের মূল্য মানুষের চেয়েও বেশি

২০২৪ সালের এপ্রিলে দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে স্যামসাং কর্মীদের এক বিশাল প্রতিবাদী ঢেউ আছড়ে পড়ে। এটি কেবল 'বেতন বাড়ানোর' কোনো সাধারণ দাবি ছিল না। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো প্রথমবারের মতো 'এআই বিপ্লবের মুনাফায় অংশীদারিত্বের' দাবিটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

শ্রমিকদের যুক্তি খুবই সহজ: কর্পোরেশনগুলো কারখানা স্থাপন এবং চিপ তৈরির জন্য সরকারের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি পায়। এই অর্থ আসলে সাধারণ নাগরিকদের করের টাকা। এআই-এর সাফল্যের ভিত্তি হিসেবে যে অবকাঠামো (বিদ্যুৎ গ্রিড, শিক্ষা, লজিস্টিকস) কাজ করছে, তা কয়েক দশক ধরে পুরো দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে। সুতরাং, এআই থেকে অর্জিত অতিরিক্ত মুনাফা কেবল প্রকৌশলীদের কৃতিত্ব নয়, বরং এটি সমগ্র জাতির অবদানের ফসল।

নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি: বাস্তবতা নাকি জনমোহিনী রাজনীতি?

আপাতদৃষ্টিতে আকর্ষণীয় মনে হলেও, 'এআই লভ্যাংশ' ধারণাটি বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতার কবলে রয়েছে।

  1. রাজনৈতিক বিভাজন: বিরোধী দলীয় নেতা লি জে-মিয়ং এই ধারণার প্রধান প্রবক্তা। তিনি একটি 'এআই ট্যাক্স' বা এআই কর প্রবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন যাতে নিঃশর্ত মৌলিক আয়ের (ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম) তহবিল গঠন করা যায়। তবে বর্তমান সরকার এখনও বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, কারণ তারা ভয় পাচ্ছে যে এতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় কোরিয়ান কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
  2. অর্থনৈতিক ঝুঁকি: এই ধারণার বিরোধীরা দাবি করছেন যে, লভ্যাংশের ১৫ শতাংশ কেটে নেওয়া হলে (যেমনটা ইউনিয়নগুলো দাবি করছে) কোম্পানিগুলো গবেষণা ও উন্নয়নের (R&D) জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল হারাবে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে দেবে।

উপসংহার

দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে এআই সংক্রান্ত বিতর্ককে 'এটি কীভাবে কাজ করে' থেকে সরিয়ে 'এর মালিকানা কার' সেই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। যদি এই পরীক্ষা সফল হয়, তবে কোরিয়া একটি 'ডিজিটাল সমাজতন্ত্রের' মডেল তৈরি করবে, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের ভবিষ্যৎ কেড়ে নেবে না বরং তা সুনিশ্চিত করবে। আর যদি পক্ষগুলো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে, তবে এআই-অভিজাত শ্রেণী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যবধান ঘুচানো অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

14 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Korea Herald

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।