২০২৬ সালের ১ জুলাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক জাতীসঙ্ঘের একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেল তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, সুচিন্তিত প্রয়োগের মাধ্যমে এআই স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুধা নিবারণ, শিক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় অগ্রগতির এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত ৪০ জন বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত এই প্যানেল প্রযুক্তিটির প্রথম বৈশ্বিক স্বাধীন বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ সম্পন্ন করেছে। এই বিশেষজ্ঞ দলে প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভুকোসি মারিভাতেও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রতিবেদনটি সকল সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এর নেতিবাচক দিকগুলোও লেখকরা সততার সাথে তুলে ধরেছেন। এআই-এর দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ব্যবহারকারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি এবং ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার থেকে শুরু করে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে। উচ্চমাত্রায় স্বায়ত্তশাসিত এআই সিস্টেমগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি এখনো উদ্ভাবিত হয়নি।
প্রযুক্তির সক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে। এআই-এর বৃহত্তম ক্লাস্টারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং রিসোর্সের ৭৫ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের দখলে রয়েছে। এটি কর্তৃত্ববাদী কব্জা এবং গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা খর্ব করার পথ প্রশস্ত করতে পারে। এআই-এর সক্ষমতা এখন বিজ্ঞানীদের বোধগম্যতা এবং সরকারের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে আর কী কী উল্লেখযোগ্য তথ্য রয়েছে?
১. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘প্রতারণামূলক আচরণ’ (Deceptive AI) প্যানেলের কো-চেয়ারম্যান ইয়োশুয়া বেঞ্জিও জানিয়েছেন যে, বিজ্ঞানীরা উন্নত এআই মডেলগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান হারে প্রতারণামূলক আচরণের প্রমাণ পাচ্ছেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, স্বায়ত্তশাসিত কার্যক্রম বা বিদ্বেষপূর্ণ ব্যবহারের ফলে এআই কোনো ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটাবে না—বিজ্ঞান বর্তমানে এমন গ্যারান্টি দিতে অক্ষম।
২. ভাষাগত বৈষম্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত ভুল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান এআই মডেলগুলো বিশ্বের ৭০০০টিরও বেশি ভাষার মধ্যে মাত্র সামান্য কিছু ভাষা সমর্থন করে। পর্যাপ্ত রিসোর্স নেই এমন ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে মেশিন ট্রান্সলেশনের ভুল ইতোমধ্যে মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনছে, যেমন ভুল রোগ নির্ণয় বা ভুল চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ।
৩. সুনির্দিষ্ট হুমকি (ডিপফেক থেকে জীববিজ্ঞান পর্যন্ত)
৪. ‘প্রমাণ সংক্রান্ত দ্বিধা’ (Evidence dilemma) এআই যে ধরনের জটিল সমস্যার সমাধান করছে, তার ব্যাপ্তি প্রতি কয়েক মাসে দ্বিগুণ হচ্ছে। যদিও বিশ্বে এআই পরিচালনার জন্য ৪০টিরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা বা ফ্রেমওয়ার্ক রয়েছে, সেগুলো এখনো বিচ্ছিন্ন এবং বাস্তবে সেগুলোর কার্যকারিতা অনেকাংশেই পরীক্ষিত নয়।
৫. ‘এজেন্টিক’ সিস্টেমের দিকে যাত্রা এবং প্রযুক্তির একীভূতকরণ প্যানেল পূর্বাভাস দিয়েছে যে, খুব শীঘ্রই স্বয়ংক্রিয় ‘এজেন্টিক’ সিস্টেমে (agentic AI) গণ-স্থানান্তর ঘটবে, যা স্বাধীনভাবে বহুমুখী কাজ সম্পন্ন করতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদে এআই-এর সাথে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও বায়োটেকনোলজির মতো রূপান্তরকারী প্রযুক্তিগুলোর একীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৬. পরিবেশগত স্বচ্ছতা ও মহাসচিবের উদ্যোগ এই প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে জাতীসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ‘এআই পরিবেশগত স্বচ্ছতা উদ্যোগ’ প্রচার করছেন। এই উদ্যোগের আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে এই শিল্পকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে কোম্পানিগুলোকে তাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট, পানির ব্যবহার এবং ডেটা সেন্টারের জন্য ব্যবহৃত ভূমির তথ্য পূর্ণ প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
৭. ‘এআই-এর জন্য আইএইএ’ গঠনের ধারণা জেনেভা সংলাপের প্রস্তুতিমূলক আলোচনায় একটি বিষয় বারবার উঠে আসছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত প্রযুক্তিগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) আদলে একটি বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করা প্রয়োজন।
৮. ‘ডিজিটাল উপনিবেশবাদ’-এর ঝুঁকি বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ কনভারসেশনাল এআই ব্যবহার করছে, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে উন্নত মডেলগুলো যাচাই করার মতো প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ নেই। এর ফলে তারা কোনো কথা বলার অধিকার ছাড়াই কেবল অন্যের তৈরি নিয়ম মানতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা বৈশ্বিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
প্রতিবেদনটি আগামী ৬–৭ জুলাই জেনেভায় অনুষ্ঠিতব্য প্রথম ‘গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্নেন্স’-এর আলোচনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এই ফোরামে জাতীসঙ্ঘের ১৯৩টি সদস্য দেশসহ শিল্পখাত, একাডেমিয়া এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।




