২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ফাইনালিস্টের নাম নির্ধারিত হলো ১৫ জুলাই। আটলান্টার এক নাটকীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে রোমাঞ্চকর জয় তুলে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের প্রায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শেষ মুহূর্তের জোড়া গোল ম্যাচের ভাগ্য পুরোপুরি পাল্টে দেয়।
ইংল্যান্ড ১ — ২ আর্জেন্টিনা
গোলদাতা: গর্ডন (৫৫ মিনিট) — এনজো ফার্নান্দেজ (৮৫ মিনিট); লাউতারো মার্টিনেজ (৯০+২ মিনিট)।
মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি শুরু থেকেই বেশ উত্তেজনাপূর্ণ ও সতর্কতাপূর্ণ ছিল। ভুলের মাশুল কতটা ভারী হতে পারে তা দুই দলই বুঝতে পেরেছিল, তাই প্রথমার্ধে মূলত রক্ষণভাগ সামলাতেই বেশি সচেষ্ট ছিল তারা।
ইংল্যান্ড যথেষ্ট শৃঙ্খলার সাথে খেলছিল, তারা মাঠের ফাঁকা জায়গাগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল এবং লিওনেল মেসিকে পেনাল্টি বক্সের সামনে বল পাওয়ার সুযোগ দিচ্ছিল না। আর্জেন্টিনা বলের দখল বেশি রাখলেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সেই আধিপত্যকে কোনো বিপজ্জনক সুযোগে রূপান্তর করতে পারেনি।
বিরতির পর ইংলিশরা হঠাৎ করেই খেলার গতি বাড়িয়ে দেয়।
গর্ডনের গোলে ফাইনালের স্বপ্নে বিভোর ইংল্যান্ড
ম্যাচের ৫৫ মিনিটে ইংল্যান্ডের এক দ্রুতগতির আক্রমণ থেকে গোল করেন অ্যান্থনি গর্ডন। হ্যারি কেইন এবং মরগান রজার্সের চমৎকার বোঝাপড়ায় গর্ডন জোরালো শট নেওয়ার সুযোগ পান এবং দলকে এগিয়ে দেন।
ইংল্যান্ডের জন্য এই গোলটি ঐতিহাসিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছানো থেকে দলটি মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে ছিল।
লিড পাওয়ার পর টমাস টুখেলের শিষ্যরা কিছুটা রক্ষণাত্মক কৌশল অবলম্বন করে। ইংল্যান্ড ধীরে ধীরে মাঠের নিয়ন্ত্রণ প্রতিপক্ষের হাতে ছেড়ে দেয় এবং নিজেদের গোল বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এই পরিকল্পনা দীর্ঘ সময় বেশ কার্যকর ছিল। গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড কয়েকবার দারুণভাবে দলকে বিপদমুক্ত করেন এবং আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ইংল্যান্ডের জমাট রক্ষণে কোনো ফাঁক খুঁজে পাচ্ছিল না।
কিন্তু শেষ মুহূর্তগুলো ইংলিশদের জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
এনজো ফার্নান্দেজের গোলে খেলায় ফিরল আর্জেন্টিনা
৮৫ মিনিটে আর্জেন্টিনা একটি ছোট কর্নার থেকে আক্রমণ শানায়। লিওনেল মেসির সহায়তায় সেই আক্রমণ থেকে এনজো ফার্নান্দেজ সমতাসূচক গোলটি করেন।
এই গোলের পর ম্যাচের চিত্রপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রতিপক্ষ কিছুটা খেই হারিয়ে ফেলেছে বুঝতে পেরে আর্জেন্টিনা অতিরিক্ত সময়ের অপেক্ষা না করেই আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে।
দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় পুরোটা সময় গোল বাঁচানোতে ব্যস্ত থাকা ইংল্যান্ড আর নতুন করে ম্যাচে ফিরতে বা বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।
লাউতারো মার্টিনেজের জয়সূচক গোল
ম্যাচের চূড়ান্ত ফয়সালা হয় ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে। মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে বদলি হিসেবে নামা লাউতারো মার্টিনেজ হেডের মাধ্যমে বল জালে জড়িয়ে দেন।
২-১ — ব্যবধানে অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচে ফিরে বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল আর্জেন্টিনা।
রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা এই আসরের অন্যতম আবেগপূর্ণ জয় উদ্যাপনে মেতে ওঠেন। অন্যদিকে, প্রায় জিতে যাওয়া ম্যাচ কয়েক মিনিটে হাতছাড়া হওয়ার আফসোস নিয়ে ইংলিশ ফুটবলাররা দীর্ঘক্ষণ মাঠে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
মেসির সেই চিরচেনা জাদুকরী ভূমিকা
লিওনেল মেসি নিজে গোল না পেলেও দলের দুটি গোলেই তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এনজো ফার্নান্দেজের গোলের শুরুতে এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক যেমন সক্রিয় ছিলেন, তেমনি লাউতারো মার্টিনেজের জয়সূচক গোলটিতেও সরাসরি অ্যাসিস্ট করেন তিনি।
৩৯ বছর বয়সে মেসি আবারও বিশ্বকাপ জেতার হাতছানি পাচ্ছেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা এখন টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে। (AP News)
অতিরিক্ত সাবধানতাই কাল হলো ইংল্যান্ডের
ম্যাচ শেষে টমাস টুখেলের কৌশল নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গর্ডনের গোলের পর ইংলিশরা আক্রমণাত্মক ফুটবল ছেড়ে কেবল লিড ধরে রাখার ওপর জোর দিয়েছিল।
খেলোয়াড় পরিবর্তন এবং অতি-রক্ষণাত্মক ছক আর্জেন্টিনার সামনে পিকফোর্ডের গোলপোস্টের কাছে যাওয়ার সহজ পথ করে দেয়। ফলস্বরূপ, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রচণ্ড চাপের মুখে আর টিকে থাকতে পারেনি তারা।
ইংল্যান্ড টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফর্ম করলেও শেষ পর্যন্ত ফাইনালের দোরগোড়ায় এসে থেমে যেতে হলো তাদের। ১৯৬৬ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ জেতার পর দ্বিতীয় শিরোপার জন্য তাদের অপেক্ষা এখনো ফুরাল না। (https://www.englandfootball.com)
আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন ফাইনাল
বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ স্পেন, যারা আগের দিন ফ্রান্সকে ২-০ গোলে পরাজিত করেছে।
শিরোপা নির্ধারণী লড়াইটি ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অনুষ্ঠিত হবে। এই ফাইনাল হতে যাচ্ছে দুই প্রজন্মের লড়াই: একদিকে লিওনেল মেসির অভিজ্ঞ দল আর অন্যদিকে লামিন ইয়ামালের নেতৃত্বাধীন স্পেনের তরুণ ব্রিগেড।
আর্জেন্টিনা তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে নামবে এবং ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে শিরোপা ধরে রাখার কৃতিত্ব গড়তে চাইবে।
১৮ জুলাই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড।
১৫ জুলাইয়ের মূল কথা: আর্জেন্টিনা কয়েক মিনিটের ঝড়ে হারের মুখ থেকে সেমিফাইনাল বাঁচিয়ে নিয়েছে, ইংল্যান্ডের স্বপ্ন চুরমার করেছে এবং টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বসেরা হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। (AP News)




