১৭ মে ২০২৬, কায়রো — মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি আজ পশ্চিম মিশরের ডবেইয়া শহরে সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প 'নিউ ডেল্টা'-র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা মাদবউলি এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে এই জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধন অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
'নিউ ডেল্টা' প্রকল্প আসলে কী?
'নিউ ডেল্টা' হলো আধুনিক মিশরের ইতিহাসে বৃহত্তম কৃষি-প্রযুক্তিভিত্তিক মেগা প্রকল্প, যার লক্ষ্য হলো পশ্চিমের মরুভূমিকে উর্বর কৃষি জমিতে রূপান্তরিত করা। এই প্রকল্পের মোট আয়তন ২৫ লক্ষ ফাদ্দান (প্রায় ১০.৫ লক্ষ হেক্টর বা ১০,৫০০ বর্গ কিলোমিটার)।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করে মিশরের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৌশলগত খাদ্যদ্রব্যের আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো।
প্রকল্পের পানি অবকাঠামো
এই প্রকল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো রাউদ আল-ফারাগ-ডবেইয়া সড়ক বরাবর প্রবাহিত ১১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কৃত্রিম নদী। কৃত্রিম নদীটির গভীরতা প্রায় ৪ মিটার এবং প্রশস্ততা প্রায় ১১ মিটার। এই খালের মাধ্যমে নীল নদ থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি কিউবিক মিটার পানি সরবরাহ করা হয়।
পানি অবকাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
- ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন
- ৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত খাল
- আল-হাম্মাম ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, যার ক্ষমতা প্রতিদিন ৭৫ লক্ষ কিউবিক মিটার — এটি কৃষিকাজের বর্জ্য পানি শোধনের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম শোধনাগার।নীল নদ থেকে আসা পানি কৃষি বর্জ্য পানির সাথে শোধন করে পুনরায় ব্যবহার করা হয়, যা পানি সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করে।কৃষি উন্নয়নপ্রকল্পের আওতায় ২৫ লক্ষ ফাদ্দান মরুভূমিকে চাষযোগ্য জমিতে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েক লক্ষ ফাদ্দান জমিতে চাষাবাদ শুরু হয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ এবং বিদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে এখানে উন্নত মানের শস্য, শাকসবজি ও ফলমূল চাষ করা হচ্ছে।প্রেসিডেন্ট আল-সিসি তার উদ্বোধনী ভাষণে বলেন যে, 'নিউ ডেল্টা' হবে মিশরের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতুবন্ধন এবং মরুভূমিকে একটি কর্মক্ষম অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করার সক্ষমতার প্রমাণ।প্রকল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্বপ্রকল্পের মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫.২৫–১৬ বিলিয়ন ডলার (বাস্তবায়নের ধাপ অনুযায়ী)। এই প্রকল্পটি মিশরের সাহারা মরুভূমি সংস্কারের একটি বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ, যার মধ্যে ১৯৬০-এর দশকে শুরু হওয়া 'নিউ ভ্যালি' প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত।আশা করা হচ্ছে যে, এই প্রকল্প সরাসরি কৃষিখাতে প্রায় ১০,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে আরও কয়েক লক্ষ মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে মিশরের কৃষি পণ্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।বাস্তবায়নের সময়রেখা২০২৩ সাল — প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণের সূচনা২০২৫ সাল — ৫.২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে প্রথম ধাপের কার্যক্রম শুরু১৭ মে ২০২৬ — প্রেসিডেন্ট আল-সিসি কর্তৃক পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনসমালোচনা ও ঝুঁকিকিছু বিশেষজ্ঞ পানি সম্পদের সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কারণ নীল নদের পানি সীমিত। এছাড়া ইথিওপিয়ার সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনের ঝুঁকিও রয়েছে, যারা নীল নদের পানির ওপর নির্ভরশীল এবং নদীতে একটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে। প্রকল্পটি পশ্চিম মরুভূমি অঞ্চলের বাস্তুসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।মিশরের জন্য কৌশলগত গুরুত্বমিশর বিশ্বের বৃহত্তম গম আমদানিকারক দেশ এবং 'নিউ ডেল্টা' প্রকল্পের লক্ষ্য হলো কৌশলগত শস্যের আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো। এই প্রকল্পটি মিশরের ১০.৫ কোটিরও বেশি ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।প্রেসিডেন্ট আল-সিসি 'নিউ ডেল্টা'-কে আধুনিক মিশরের ইতিহাসে বৃহত্তম নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শেখ মুহাম্মদ আহমেদ হাসান কর্তৃক কোরআন তেলাওয়াত এবং প্রকল্পের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।




