২০২৬ সালের মে মাসে একদল আন্তর্জাতিক গবেষক একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশ করেছেন। তাদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, হাই তোলার বিষয়টি কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি জন্মের অনেক আগেই মায়ের শরীর থেকে ভ্রূণের মধ্যে সঞ্চারিত হতে পারে। এই আবিষ্কারটি প্রসবপূর্ব বিকাশের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
ইতালির ইউনিভার্সিটি অফ পারমা-র একদল বিজ্ঞানী এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। গবেষক জুলিয়া ডি’আদামো-র তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক গবেষণায় ৫২ জন অন্তঃসত্ত্বা মহিলার ওপর নিবিড় আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান করা হয়। এই পরীক্ষার ফলাফল বিজ্ঞানীদের রীতিমতো বিস্মিত করে দিয়েছে এবং গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচন করেছে।
গবেষণার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, যখনই মা হাই তুলেছেন, প্রায় ৬৮ শতাংশ ক্ষেত্রে গর্ভস্থ ভ্রূণের মধ্যেও ঠিক একই ধরনের শারীরিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। আল্ট্রাসাউন্ডে ভ্রূণের চোয়ালের পেশি সংকোচন এবং ডায়াফ্রামের নড়াচড়া স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে, যা মায়ের হাই তোলার প্রতিক্রিয়ার সাথে হুবহু মিলে যায়।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, এই বিশেষ ধরনের শারীরিক সমন্বয় বা সিনক্রোনাইজেশন গর্ভাবস্থার মাত্র ২৬তম সপ্তাহ থেকেই লক্ষ্য করা গেছে। এর অর্থ হলো, ভ্রূণ গর্ভের ভেতরে থাকাকালীনই বাইরের উদ্দীপনায় সাড়া দিতে শুরু করে এবং মায়ের শারীরিক পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে শেখে।
কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দেয়—গর্ভস্থ শিশু যেখানে মায়ের মুখ দেখতে পায় না, সেখানে এই অনুকরণ কীভাবে সম্ভব? এটি কি কেবলই একটি কাকতালীয় ঘটনা নাকি এর পেছনে গভীর কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ লুকিয়ে রয়েছে? গবেষকরা এই রহস্যের জট খোলার চেষ্টা করেছেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনো সাধারণ সামাজিক অনুকরণ বা দেখে শেখা বিষয় নয়। বরং এটি একটি গভীর শারীরবৃত্তীয় অনুরণন বা ফিজিওলজিক্যাল রেজোন্যান্স। যখন একজন মা হাই তোলেন, তখন তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রায় পরিবর্তন আসে, ডায়াফ্রামের অবস্থান পরিবর্তিত হয় এবং হরমোনের একটি সাময়িক প্রবাহ ঘটে।
এই শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনগুলো প্লাসেন্টা বা অমরা-র মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রূণের রক্তপ্রবাহে পৌঁছে যায়। ফলে ভ্রূণ কেবল মায়ের আচরণ নকল করে না, বরং তার শরীরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই শারীরিক অনুভূতিটি সরাসরি অনুভব করে এবং প্রতিক্রিয়া দেখায়।
এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখক হলেন অধ্যাপক ভিত্তোরিও গালেস, যিনি বিশ্বজুড়ে মিরর নিউরন বা দর্পণ স্নায়ুর আবিষ্কারক হিসেবে সুপরিচিত। তার এই গবেষণায় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, মানুষের মস্তিষ্ক জন্মের অনেক আগেই সামাজিক যোগাযোগের প্রাথমিক ধাপগুলো সম্পন্ন করার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে।
গর্ভাবস্থায় এই ধরনের সূক্ষ্ম মোটর মুভমেন্ট বা নড়াচড়াগুলো আসলে শিশুর ভবিষ্যতের মোটর কর্টেক্স এবং শারীরিক সমন্বয় ব্যবস্থার মজবুত ভিত্তি তৈরি করে। এটি শিশুর মস্তিষ্কের স্নায়বিক বিকাশের একটি অপরিহার্য প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কাজ করে যা পরবর্তী জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, বিজ্ঞানের জন্য এই তথ্যের প্রয়োজনীয়তা ঠিক কোথায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আধুনিক প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গভীরে। গবেষকরা আশা করছেন যে, এই মোটর সিনক্রোনাইজেশন বা শারীরিক সমন্বয়ের হার পর্যবেক্ষণ করে শিশুর স্নায়বিক বিকাশের প্রাথমিক সংকেত পাওয়া সম্ভব হবে।
প্রসবপূর্ব এই জৈবিক ছন্দে যদি কোনো ধরনের বিচ্যুতি দেখা দেয়, তবে তা ভবিষ্যতে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার বা এএসডি-র মতো স্নায়বিক সমস্যার ঝুঁকি শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। যত দ্রুত মস্তিষ্কের এই সংযোগগুলোর বৈশিষ্ট্য বোঝা যাবে, শিশুর জন্য পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা ততটাই কার্যকর হবে।
প্রসবপূর্ব স্নায়ুবিজ্ঞানের এই জগতটি আমাদের সামনে কেবল উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। এই আবিষ্কারটি আগের সেই পুরনো তত্ত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, যেখানে মনে করা হতো যে হাই তোলার মাধ্যমে সহানুভূতি বা এম্প্যাথি প্রকাশের বিষয়টি কেবল জন্মের পরেই বিকশিত হয়।
গবেষকরা এখন তাদের পরবর্তী পরীক্ষার পরিকল্পনা করছেন। তারা দেখতে চান যে, জন্মের পর মা ও শিশুর এই বিশেষ সংযোগটি কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং এটি শিশুর আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের বিকাশে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলে।
পরিশেষে বলা যায়, মা ও শিশুর মধ্যে এই অদৃশ্য এবং গভীর সংলাপটি শুরু হয় তাদের একে অপরের চোখের দিকে প্রথমবার তাকানোর অনেক আগে থেকেই। এই গবেষণাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাতৃত্বের বন্ধন কেবল জন্মের পরের কোনো বিষয় নয়, বরং এটি গর্ভাবস্থার গভীর থেকেই শারীরবৃত্তীয়ভাবে প্রোথিত থাকে।




