তিনি এমন একজন নারী যার দিকে তাকালে আপনি অজান্তেই নিজেকে প্রশ্ন করবেন: সময় কি আদৌ বহমান? ৬৭ বছর বয়সেও মিশেল ফাইফার যখন জনসমক্ষে আসেন, তখন তাঁর সুগঠিত চোয়াল, মসৃণ ত্বক আর সেই চিরচেনা উজ্জ্বল হাসি দেখে মনে পড়ে যায় ‘স্কারফেস’ বা ‘মিট দ্য ফকার্স’-এর সেই দিনগুলোর কথা, যা দর্শকদের পাগল করে দিত। কৃত্রিমভাবে টেনে ধরা মুখ কিংবা পাথুরে ভাব নয়—বরং এখানে দেখা যায় এক প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিক সৌন্দর্য, যা কেবল নিজের গোপন রহস্য জানা এক নারীর পক্ষেই সম্ভব। আর তিনি সেই রহস্য সবার সাথে ভাগ করে নিতে প্রস্তুত।
সিগারেট আর সোডা থেকে সচেতন খাদ্যাভ্যাস
মিশেলের সুস্বাস্থ্যের পথটি খুব একটা সহজ ছিল না। নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ীই, যৌবনে তিনি অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতেন—সারাদিন সাগরে সার্ফিং চলত, আর খাবারের নামে চলত কেবল সিগারেট, কফি আর সোডা। এমনকি তিনি ‘ব্রেদারিয়ান’ নামক এক চরমপন্থী গোষ্ঠীর খপ্পরেও পড়েছিলেন, যারা তাঁকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে মানুষ খাবার ছাড়াই কেবল সূর্যালোক খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। সৌভাগ্যবশত, তিনি সেই তথাকথিত ‘জ্ঞানের শিখরে’ পৌঁছানোর আগেই ফিরে আসেন, তবে তিনি স্বীকার করেন যে সেটি ছিল পুরোপুরি উন্মাদনা।
বর্তমান চিত্রটা অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ সময় মিশেল ভেগান ডায়েট মেনে চলেছেন—তিনি জানিয়েছিলেন যে উদ্ভিজ্জ খাবারে অভ্যস্ত হওয়ার পরপরই তাঁর ত্বকের উন্নতি নজরে আসে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অভিনেত্রী প্যালিও ডায়েটে ফিরে গেছেন, যেখানে তিনি মাংস এবং প্রচুর শাকসবজি খান। তিনি খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেন যে তাঁর শরীরে মেদ জমার প্রবণতা রয়েছে, তাই তাঁকে সবসময় নিজের খাবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়। তাঁর মূলমন্ত্র খুব সাধারণ: ফলমূল, শাকসবজি আর টক্সিনমুক্ত পরিচ্ছন্ন খাবার—আর এর প্রতিদান হিসেবে শরীরও তাঁকে সতেজ রাখে।
শরীরচর্চাই যার উপাসনা
সৌন্দর্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কী—মিশেলকে এই প্রশ্ন করলে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলবেন: ব্যায়াম। এই অভিনেত্রী বলেন, “সত্যি বলতে, নিজের জন্য আপনি যা করতে পারেন তার মধ্যে এটিই সেরা।” তিনি নিশ্চিত যে, ভালো থাকার জন্য যদি মাত্র একটি কাজ বেছে নিতে হয়, তবে সেটি হবে প্রতিদিন ঘাম ঝরানো এবং নিয়মিত শরীরচর্চা।
তাঁর ফিটনেস রুটিন বৈচিত্র্যে ভরপুর: সকালের অভ্যাসে তিনি পাইলেটস, যোগব্যায়াম এবং দৌড়ানোর মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এছাড়া মিশেল ট্রেডমিলের ওপর নাচতে খুব পছন্দ করেন! তাঁর ট্রেনারের মতে, হাঁটা, সাইক্লিং, যোগব্যায়াম এবং পাইলেটসের এই সমন্বয়টি এই বয়সে শরীরের সমস্ত প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। ফলাফল? ৬৬ বছর বয়সে যখন তিনি সাঁতারের পোশাকে নিজের ছবি প্রকাশ করেন, তখন তা দেখে ইন্টারনেটে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল।
রাত ৯টায় ঘুম—কোনো জাদু নয়
তাঁর আরেকটি অপ্রকাশিত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রহস্য হলো—ঘুম। মিশেল রাত ৯টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন। তিনি ধূমপান করেন না—যৌবনের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে যে শৃঙ্খলা তিনি তৈরি করেছেন, এটি তারই অংশ। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম হলো এমন একটি ভিত্তি, যার ওপর তাঁর রূপ সৌন্দর্য টিকে আছে।
ত্বকের যত্ন: যতটা ভাবছেন তার চেয়েও সহজ
‘স্কারফেস’ খ্যাত এই তারকা ভেজালমুক্ত বা ক্লিন কসমেটিকসের একনিষ্ঠ প্রবক্তা। তিনি এমনকি ‘হেনরি রোজ’ নামে নিজের একটি পারফিউম ব্র্যান্ডও চালু করেছেন, যা বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ স্বচ্ছ সুগন্ধি লাইন হিসেবে পরিচিত এবং এর প্রতিটি উপাদান বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়। তবে তাঁর প্রতিদিনের ত্বকের যত্ন নেওয়ার পদ্ধতিটি বিস্ময়করভাবে সংক্ষিপ্ত।
মিশেল বলেন, “আমার রুটিন খুব সাধারণ: আমি ত্বক পরিষ্কার করি এবং ময়েশ্চারাইজার লাগাই—ব্যাস, এটুকুই।” এই অভিনেত্রী কেবল মুখের সৌন্দর্য নয়, বরং ঘাড়, গলা এবং শরীরের ত্বকের প্রতিও সমান মনোযোগ দেন। তাঁর ব্যাগে সবসময় একটি কনসিলার থাকে—তবে সেটি বলিরেখা লুকানোর জন্য নয়, বরং ত্বকের লালচে ভাব কমাতে ব্যবহার করেন।
এছাড়া তিনি তাঁর চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের দেওয়া একটি পরামর্শ মেনে চলেন যা তিনি সেরা বলে মনে করেন: “আপনার যত ম্যাগনিফাইং বা বিবর্ধক আয়না আছে সব ছুঁড়ে ফেলে দিন!”
বয়সকে গ্রহণ করা—আর মুক্তি পাওয়া
সম্ভবত মিশেল ফাইফারের আসল রহস্য কোনো ডায়েট বা পাইলেটসে নয়, বরং তাঁর মানসিকতায় নিহিত। এই অভিনেত্রী স্বীকার করেন যে আয়নার বদলে বড় পর্দায় নিজেকে বুড়ো হতে দেখাটা অনেকের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর। তিনি বলেন, “এর ফলে আপনি একসময় চরম হতাশার চূড়ায় পৌঁছে যান।”
তবে তিনি এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ খুঁজে পেয়েছেন। মিশেলের মতে, “কারও বয়সের তুলনায় তাকে খুব তরুণ দেখাচ্ছে”—এই ধারণাটিই আসলে ভুল। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিটি হলো: “আমি আমার বয়স অনুযায়ী দারুণ দেখতে!” “আমাকে আর কচি সাজার বা তরুণ দেখানোর চেষ্টা করতে হবে না।” “এখন থেকে আর মোটেও নয়!”
এই দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর মতে, এক অদ্ভুত স্বাধীনতার অনুভূতি দেয়। তিনি হেসে বলেন, “আমি পাহাড়ের চূড়া পার হয়ে এখন সঠিক দিকে অবস্থান করছি।”
ভালোবাসার পাঠ
মিশেল তাঁর ব্যক্তিগত জীবন কখনও খুব একটা আড়াল করেননি, আবার তা নিয়ে খুব বেশি মাতামাতিও করেননি। তাঁর জীবনে দুটি বিয়ে এসেছিল। পিটার হর্টনের সাথে তাঁর প্রথম বিয়েটি খুব অল্প বয়সে হয়েছিল, যা তিনি প্রায় ভুলেই গেছেন: “আমার সন্তানরা জানতই না যে তাদের বাবার আগে আমার অন্য কারও সাথে বিয়ে হয়েছিল।” টেলিভিশন প্রযোজক ডেভিড কেলির সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়েটিই ছিল সেই গন্তব্য যেখানে তিনি স্থিত হয়েছেন। মিশেল বলেন, “ডেভিডের সাথে পরিচয়ের পর আমি অনেক কিছু নতুন করে উপলব্ধি করেছি।”
তাঁর উপলব্ধি হলো, জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার পর ৩০ বছর বয়সের পরেই বিয়ে করা উচিত। তাঁর এই পরিপক্কতা এবং নিজের ভুল ও বয়সকে সানন্দে গ্রহণ করে নেওয়ার ক্ষমতাই তাঁকে এমন এক নারীতে পরিণত করেছে, যাঁর থেকে চোখ ফেরানো অসম্ভব।
মিশেল ফাইফার এই সত্যেরই জ্যান্ত প্রমাণ যে, ৬০ বছরের পর সৌন্দর্য কেবল জিনের লটারি নয়। এটি একটি কঠোর শৃঙ্খলা। এটি এক ধরণের সচেতনতা। এটি নিজেকে ভালোবাসার এক বিশেষ বহিঃপ্রকাশ, যা আপনাকে ৪০ বছরের মতো দেখানোর দাবি করে না, বরং যেকোনো বয়সে পূর্ণ উদ্যমে বেঁচে থাকার প্রেরণা দেয়।


