নতুন কোনো টেলিস্কোপ তৈরির বদলে মার্কিন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কক্ষপথে একটি রোবট পাঠাচ্ছে নাসা, যার লক্ষ্য সচল একটি যন্ত্রকে রক্ষা করা। এটি কেবল একটি কারিগরি পরীক্ষা নয়, বরং মহাকাশ অবকাঠামোর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত: যা এককালীন ব্যবহারের ধারণা থেকে দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
NASA rushes to save Swift telescope from falling back to Earth with $30 million rescue mission trib.al/JoWvF3j
২০০৪ সালে উৎক্ষেপণ করা সুইফট টেলিস্কোপটি গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গামা-রশ্মি বিস্ফোরণ এবং নক্ষত্রের মহাবিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণ করে আসছে। অতিরিক্ত সৌর সক্রিয়তার কারণে এটি স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত উচ্চতা হারাচ্ছে এবং অক্টোবরের মধ্যে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে। এই ক্ষতি এড়াতে নাসা স্টার্টআপ কোম্পানি ‘ক্যাটালিস্ট স্পেস টেকনোলজিস’-এর সাথে ৩ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে। তিনটি যান্ত্রিক হাত বিশিষ্ট তাদের ‘লিঙ্ক’ নামের মহাকাশযানটি সুইফট টেলিস্কোপের কাছে গিয়ে সেটিকে আটকে ফেলবে এবং এর কক্ষপথ ৩৬০ থেকে ৬০০ কিলোমিটারে উন্নীত করবে।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি অ্যাটল থেকে পেগাসাস রকেটের মাধ্যমে এই মিশনটি শুরু হবে। এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রথম প্রচেষ্টা; এর আগে শুধুমাত্র চীন এমন অভিযান পরিচালনা করেছে। ক্যাটালিস্ট-এর প্রধানের মতে, এর সাফল্য কক্ষপথ ভিত্তিক পরিষেবা শিল্পের পথ প্রশস্ত করবে—যার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ থেকে শুরু করে মেরামত এবং এমনকি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুইফট টেলিস্কোপটি মেরামতের উপযোগী করে তৈরি করা হয়নি। এর কাঠামোতে রোবট দিয়ে ধরার বা সংযুক্ত হওয়ার কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেই। লিঙ্ক রোবটটি একটি ছোট রেফ্রিজারেটরের মতো আকারের এবং লেগো পুতুলের মতো ‘আঙুল’ বিশিষ্ট, যাকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত দায়িত্বটি পালন করতে হবে। এই অভিযান সফল হলে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই টেলিস্কোপটি কাজে ফিরবে এবং জেমস ওয়েব ও রোমান টেলিস্কোপের নতুন সব আবিষ্কারের ক্ষেত্রে ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবে।
এখানে আর্থিক বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। সুইফটের বিকল্প তৈরি করতে শত শত কোটি ডলার খরচ হবে, অথচ নাসার অ্যাস্ট্রোফিজিক্স খাতের বাজেট সীমিত। ফেব্রুয়ারি মাসে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় এর উচ্চতা হ্রাস কিছুটা কমলেও তা যথেষ্ট নয়। লিঙ্ক মিশনটি মূলত নতুন কিছু তৈরির বদলে বিদ্যমান একটি সম্পদের মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।
উদ্ধার অভিযানের পরবর্তী সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে হাবল টেলিস্কোপ। যদিও এর বয়স ৩৬ বছর এবং শাটল যুগে মহাকাশচারীরা এটি মেরামত করেছিলেন, বর্তমানে এটিও উচ্চতা হারাচ্ছে। ক্যাটালিস্ট ২০২৮ সালে আরও শক্তিশালী একটি রোবট পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। সুইফটের এই পরীক্ষাটি যদি প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করে, তবে নতুন ও ব্যয়বহুল মিশনের একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প তৈরি হবে।
এই কারিগরি খুঁটিনাটির অন্তরালে একটি গভীর পরিবর্তন লুকিয়ে আছে: মহাকাশ এখন আর কেবল রকেট পাঠিয়ে ভুলে যাওয়ার জায়গা নয়। মহাকাশযানগুলো এখন দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামোর অংশ হয়ে উঠছে, যা মেরামত এবং আধুনিকায়ন করা সম্ভব। এটি মহাকাশ গবেষণার অর্থনীতি বদলে দিচ্ছে এবং ক্রমাগত বাজেট বৃদ্ধির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনছে।
লিঙ্ক-এর সাফল্য বা ব্যর্থতাই বলে দেবে যে এই পুরো শিল্পের জন্য কক্ষপথ ভিত্তিক পরিষেবা প্রদানের ধারণাটি কতটা বাস্তবসম্মত। যাই ঘটুক না কেন, এই মিশনটি ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরির বিশাল খরচ ছাড়াই পুরনো মানমন্দিরগুলোকে পুনরায় সচল করা সম্ভব।


