মহাকাশের প্রাত্যহিক জীবন কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্রের চেয়ে বেশ ভিন্ন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) আমাদের পরিচিত সুযোগ-সুবিধাগুলো নেই, সেখানে প্রতিটি লিটার পানি আর প্রতিটি গ্রাম মালামাল নিখুঁতভাবে হিসেব করে নেওয়া হয়। এর প্রধান কারণ হলো মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা অতি-ক্ষুদ্র অভিকর্ষজ বল এবং কক্ষপথে মালামাল পাঠানোর আকাশচুম্বী খরচ।
মহাকাশচারীদের সাধারণ একটি দিন কীভাবে কাটে, তা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা যাক।
১. তারা কীভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকেন? (শূন্য অভিকর্ষে গোসল করা মানেই মহাবিপদ)
আইএসএস-এ কোনো শাওয়ার বা গোসলখানা নেই। মহাকাশচারী যদি সাধারণ পানির কল খুলে দিতেন, তবে পৃষ্ঠটানের কারণে পানি মেঝেতে না পড়ে তার শরীরে একটি ঘন কম্পমান আস্তরণ হিসেবে লেপ্টে থাকত, যা তার শ্বাসনালীতে ঢুকে শ্বাসরোধের কারণ হতে পারত। এছাড়া পানির ফোঁটা যদি ভেন্টিলেশন বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিতে ঢুকে যেত, তবে শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকত।
পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পদ্ধতি:
- শরীর: মহাকাশচারীরা সাধারণ ওয়েট ওয়াইপস এবং বিশেষ ওয়াটারলেস শাওয়ার জেল ব্যবহার করেন, যা ধুয়ে ফেলার প্রয়োজন হয় না। জেলটি শরীরে মেখে ঘষে নেওয়ার পর তোয়ালে দিয়ে মুছে ফেলা হয়।
- চুল: চুলের জন্য পানিহীন শ্যাম্পু ব্যবহৃত হয়। এটি চুলে লাগিয়ে মাথার ত্বক ম্যাসাজ করার পর তোয়ালে দিয়ে মুছে নেওয়া হয়।
- শেভিং: পুরুষরা ইলেকট্রিক শেভার ব্যবহার করেন এবং সাথে একটি বিশেষ ভ্যাকুয়াম ডাস্ট কালেক্টর থাকে, যা কাটা চুলগুলো শুষে নেয় যাতে সেগুলো স্টেশনের ভেতর উড়ে না বেড়ায়।
- দাঁত মাজা: মহাকাশচারীরা সাধারণ টুথব্রাশ ও পেস্ট ব্যবহার করেন। পানীয়র প্যাকেট থেকে ২-৩ ফোঁটা পানি দিয়ে ব্রাশটি ভিজিয়ে নেওয়া হয়। ব্রাশ করার পর মুখ কুলকুচি করে ধোয়া হয় না—ফেনা হয় গিলে ফেলা হয় (ব্যবহৃত পেস্টটি নিরাপদ) অথবা টিস্যু পেপারে থুতু ফেলা হয়। টিস্যু দিয়ে মুখ ও ব্রাশ ভালো করে মুছে নেওয়া হয়। ব্যবহৃত টিস্যুগুলো ফেলে না দিয়ে অন্যান্য ময়লার সাথে এয়ারটাইট প্যাকেটে ভরে ফেলা হয়। এরপর আরও এক ফোঁটা পানি দিয়ে ব্রাশ ধুয়ে, টিস্যু দিয়ে মুছে ব্যক্তিগত কন্টেইনারে রাখা হয়।
২. জামাকাপড় ধোয়া হয় কীভাবে? (ওয়াশিং মেশিন একটি বিলাসিতা)
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো: একেবারেই নয়। মহাকাশ স্টেশনে কোনো ওয়াশিং মেশিন নেই। পানির ওজন অনেক বেশি, আর কক্ষপথে পানি পাঠানোর খরচও আকাশছোঁয়া।
কাপড় নিয়ে যা করা হয়: মহাকাশচারীরা একটি কাপড় ততক্ষণই পরেন যতক্ষণ না তা নোংরা হয় বা ঘামের গন্ধে দুর্গন্ধযুক্ত হয়। এরপর জামাকাপড়গুলো এয়ারটাইট ব্যাগে ভরে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া হয়। মালবাহী জাহাজগুলোর (যেমন ‘প্রগ্রেস’ বা ‘সিগনাস’) সাথে এই ‘নোংরা’ কাপড়গুলো বায়ুমণ্ডলের সংস্পর্শে এসে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ব্যতিক্রম: সম্প্রতি নাসা কিছু পরীক্ষামূলক ব্যাগ পরীক্ষা করছে যেখানে সামান্য ডিটারজেন্ট দিয়ে ইউনিফর্ম ও মোজা ভিজিয়ে রাখা যায়, তবে এটি এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই মহাকাশের পোশাক একবার ব্যবহারের জন্যই তৈরি।
৩. তারা টয়লেট করেন কীভাবে? (এটি অভিকর্ষ নয়, বরং সাকশন পদ্ধতিতে কাজ করে)
পৃথিবীতে টয়লেটে ফ্লাশ করলে অভিকর্ষের টানে ময়লা নিচে নেমে যায়। মহাকাশে এই নিয়ম খাটে না। মহাকাশের টয়লেট মূলত বিভিন্ন আকারের ফানেলযুক্ত একটি শক্তিশালী ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো।
- মূত্রত্যাগ: মহাকাশচারীরা ফানেল লাগানো একটি বিশেষ পাইপ ব্যবহার করেন। বাতাসের প্রবাহ প্রস্রাবকে টেনে ভেতরের দিকে নিয়ে যায় যাতে তা বাইরে ছড়িয়ে না পড়ে।
- মলত্যাগ: টয়লেটের সিটে বিভিন্ন ব্যাসের ছিদ্র থাকে। মহাকাশচারীকে একদম নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে পারদর্শী হতে হয়, অন্যথায় পুরো স্টেশনের জন্য ফলাফল হবে ভয়াবহ। বর্জ্যগুলো আলাদা প্যাকেটে জমা হয়, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিল হয়ে যায় এবং বাতাসের চাপে সংকুচিত করা হয়।
- বর্জ্যের শেষ গন্তব্য: কঠিন বর্জ্যগুলো কন্টেইনারে ভরে বায়ুমণ্ডলে পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু প্রস্রাব চলে যায় পুনরুৎপাদন ব্যবস্থায় এবং অত্যন্ত জটিল পরিশোধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়।
ফলাফল কী হয়?
এই বহুমুখী পরিশোধন ব্যবস্থার শেষে পাওয়া যায় রাসায়নিকভাবে বিশুদ্ধ পাতিত পানি। এটি স্টেশনের মূল পানির আধারে জমা হয় এবং জীবনদায়ী ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হয়।
৪. অনেক পানি পান করা হয়। স্টেশনে কি তবে টন টন পানি থাকে?
না, স্টেশনে টন টন পানির মজুদ নেই। এবং এর কারণ নিচে দেওয়া হলো।
আইএসএস-এ এক কেজি মালামাল পাঠানোর খরচ রকেট ভেদে প্রায় ২,০০০ থেকে ৫,০০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। একজন মহাকাশচারীর প্রতিদিন প্রায় ২-৩ লিটার পানীয় জল প্রয়োজন, সেই সাথে খাবার তৈরি এবং বাতাসে আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্যও পানি লাগে। ৬ জন সদস্যের একটি দল বছরে প্রায় ৫-৬ টন পানি ব্যবহার করে। পৃথিবী থেকে এতো বিপুল পরিমাণ পানি বয়ে নিতে কেবল পরিবহনেই খরচ হবে কোটি কোটি ডলার।
তাহলে পানি আসে কোথা থেকে? সবকিছু থেকে! মহাকাশ স্টেশনে কাজ করে একটি ‘ক্লোজড লুপ লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম’ (ECLSS), যা প্রকৌশলবিদ্যার এক বিস্ময়। এটি প্রায় ৯৮% কার্যকারিতার সাথে আর্দ্রতা পুনরুৎপাদন করতে পারে।
১. প্রস্রাব: বিশেষ এক ধরনের সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্র প্রস্রাব থেকে পানি আলাদা করে। এরপর জটিল রাসায়নিক ও তাপীয় শোধন (জিঙ্ক অক্সাইড ও সিলভার আয়ন ট্রিটমেন্টসহ) শেষে এটি স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানিতে পরিণত হয়।
২. ঘাম ও নিঃশ্বাস: মানুষ ঘামে এবং নিঃশ্বাসের সাথে জলীয় বাষ্প ত্যাগ করে। স্টেশনের এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম বাতাস থেকে সেই আর্দ্রতা শুষে নেয়।
৩. পরিচ্ছন্নতা: ব্যবহৃত ভেজা টিস্যু ও তোয়ালেতে থাকা অবশিষ্ট পানিটুকুও নিংড়ে বের করে নেওয়া হয়।
এই সমস্ত সংগৃহীত তরল বহুমুখী ফিল্টার ও মিনারলাইজারের মধ্য দিয়ে যায় এবং আয়োডিন দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়। এই পানি প্রাথমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হয়:
- অক্সিজেন উৎপাদন: পাতিত পানিকে ইলেক্ট্রোলাইসিস সিস্টেমে পাঠানো হয়। বিদ্যুৎ প্রবাহের মাধ্যমে পানির অণু ভেঙে অক্সিজেন তৈরি করা হয়, যা ক্রু সদস্যরা শ্বাস নেওয়ার জন্য ব্যবহার করেন।
- প্রযুক্তিগত কার্যক্রম: স্টেশনের কুলিং সিস্টেম সচল রাখা, বাতাসের আর্দ্রতা বজায় রাখা এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ প্রকৌশল ব্যবস্থায় এই পানি ব্যবহৃত হয়।
উপসংহার: মহাকাশচারীরা যে পানি পান করেন, তা বিশুদ্ধতার দিক থেকে পৃথিবীর যেকোনো বোতলজাত পানির চেয়ে অনেক গুণ উন্নত। মহাকাশচারীরা মজা করে বলেন: “গতকালের কফিই হলো আজকের কফি।”
মহাকাশচারীরা পৃথিবীর মানুষের মতোই সমপরিমাণ (প্রায় ২-৩ লিটার) পানি পান করেন। কিন্তু তারা বড় ট্যাংকে টন টন পানি জমিয়ে রাখেন না। তারা নিজেদের বর্জ্য থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি তৈরি করেন, যা মহাকাশের প্রাত্যহিক জীবনকে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত রিসাইক্লিং সিস্টেমে পরিণত করেছে।
৫. তারা কী খান? (রুটি খাওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
মহাকাশের খাবার এখন আর শুধু ‘টিউবের ভেতরে থাকা মণ্ড’ নয়। বর্তমানে মহাকাশচারীদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে শত শত পদ: স্যুপ, বোর্স্ট, মাংস, মাছ, মিষ্টান্ন এবং তাজা ফলমূল (যা অবশ্য পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই খেয়ে ফেলা হয়)।
মহাকাশ রান্নাঘরের প্রধান নিয়ম হলো—কোনো গুঁড়ো বা টুকরো রাখা যাবে না! পৃথিবীতে রুটির টুকরো টেবিলে পড়ে যায়, কিন্তু শূন্য অভিকর্ষে এটি পুরো মডিউলে উড়তে থাকবে। এই টুকরোগুলো মহাকাশচারীর চোখে ঢুকে যেতে পারে বা আরও খারাপ হলো, ভেন্টিলেশন ফিল্টারে আটকে গিয়ে দামি যন্ত্রপাতি নষ্ট করে দিতে পারে। তাই রুটির বদলে মহাকাশচারীরা তোরতিয়া (চ্যাপ্টা রুটি) খান। এতে স্যান্ডউইচ বানানো যায় এবং এগুলো থেকে কোনো গুঁড়ো বের হয় না।
খাবার প্রধানত দুইভাবে সরবরাহ করা হয়:
১. থার্মো-স্ট্যাবিলাইজড (পাউচে ভরা থাকে, যা অনেকটা বেবি ফুড বা সামরিক রেশন প্যাকেটের মতো)।
২. সাবলিম্যাটেড (পানিশূন্য)। খাওয়ার আগে প্যাকেটের একটি বিশেষ পোর্টের মাধ্যমে সিরিঞ্জ দিয়ে গরম পানি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
মসলা (লবণ, গোলমরিচ, সস) তরল আকারে ছোট প্যাকেটে দেওয়া হয়, কারণ শুকনো গুঁড়ো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
৬. শূন্য অভিকর্ষে তারা ঘুমান কীভাবে (এবং ঘুমের ঘোরে উড়ে যান না কেন)
মহাকাশে শরীর অবাধে ভাসতে থাকে, তাই পৃথিবীর মতো বিছানায় শুয়ে পড়া সম্ভব নয়—ঘুমের মধ্যে মহাকাশচারী অন্য মডিউলে ভেসে যেতে পারেন বা কোনো যন্ত্রপাতির সাথে ধাক্কা খেতে পারেন।
আইএসএস-এ ঘুমের জায়গা
ক্রু মেম্বারদের প্রত্যেকের জন্য একটি ব্যক্তিগত ক্যাবিন থাকে—যা প্রায় টেলিফোন বুথের আকারের সমান। এর ভেতরে থাকে:
- একটি স্লিপিং ব্যাগ, যা দেয়ালের সাথে আটকানো থাকে (খাড়াভাবে, আড়াআড়ি বা উল্টো করে—মহাকাশে এর কোনো পার্থক্য নেই)
- ল্যাপটপ রাখার জন্য ছোট টেবিল
- ব্যক্তিগত জিনিস: পরিবারের ছবি, হেডফোন, বই
- ভেন্টিলেশন গ্রিল—এটি ছাড়া ঘুমের সময় নিঃশ্বাসের সাথে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড মাথার চারপাশে জমে শ্বাসরোধ করতে পারে
নিজেকে স্থির রাখেন কীভাবে?
১. স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে ঢুকে চেইন লাগিয়ে দেন
২. বেল্ট দিয়ে ব্যাগটিকে দেয়াল বা সিলিংয়ের সাথে আটকে দেন
৩. হাতগুলো হয় ব্যাগের ভেতরে রাখেন নাহলে বাইরে ঝুলিয়ে রাখেন—কিছু মহাকাশচারী ঘুমের সময় হাতগুলো অবাধে ভাসতে দিতে পছন্দ করেন (দেখতে কিছুটা ভুতুড়ে লাগলেও এটি স্বাভাবিক)
৪. মাথা বেল্ট দিয়ে আটকে রাখা হয়, নাহলে এটি নড়াচড়া করবে এবং ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাবে
মহাকাশে ঘুমের বৈশিষ্ট্য
- বালিশের প্রয়োজন নেই—কারণ মাথা কোনো তলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে না
- পৃথিবীর মতোই তারা ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমান
- স্বপ্ন দেখেন, তবে মহাকাশচারীদের মতে অভিকর্ষ না থাকায় স্বপ্নগুলো অনেক বেশি উজ্জ্বল ও অদ্ভুত হয়
- শব্দ—ফ্যান ও যন্ত্রপাতির নিরন্তর গুঞ্জন (প্রায় ৬০ ডেসিবেল) থাকে, তাই সবাই কানে প্লাগ লাগিয়ে ঘুমান
- সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত—কক্ষপথে প্রতি ৯০ মিনিটে একবার সূর্য ওঠে ও ডোবে (দিনে ১৬ বার), তাই রাতে জানালার পর্দা টেনে দেওয়া হয়
মহাকাশচারীরা কী বলেন?
অনেকেই মনে করেন শূন্য অভিকর্ষে ঘুম পৃথিবীর চেয়েও আরামদায়ক:
- মেরুদণ্ড বা জয়েন্টের ওপর কোনো চাপ থাকে না
- শরীর পুরোপুরি শিথিল থাকে
- পাশ ফেরার প্রয়োজন হয় না—সামান্য হাত নাড়ালেই শোয়ার ভঙ্গি পরিবর্তন করা যায়
তবে কিছু অসুবিধাও আছে: পড়ে যাওয়ার অনুভূতি (মস্তিষ্ক শূন্য অভিকর্ষকে অবাধে পড়ে যাওয়া হিসেবে ধরে নেয়) এবং ভেন্টিলেশনের অবিরাম শব্দ।
৭. কক্ষপথে শরীরচর্চা কেবল ফিট থাকার উপায় নয়, বরং এটি একটি অপরিহার্য জীবনশৈলী। মাইক্রোগ্র্যাভিটির পরিবেশে মানুষের পেশি ও হাড় স্বাভাবিক চাপ অনুভব করে না। ব্যায়াম না করলে মহাকাশচারী দ্রুত পেশির শক্তি হারাবেন এবং হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাবে (ক্যালসিয়াম ক্ষয়ের কারণে), ফলে পৃথিবীতে ফেরার পর তিনি নিজে থেকে দাঁড়িয়ে হাঁটতে পারবেন না।
এটি প্রতিরোধ করতে মহাকাশ স্টেশনের ক্রু সদস্যরা প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ২.৫ ঘণ্টা ব্যায়ামের পেছনে ব্যয় করেন।
ব্যায়ামের প্রক্রিয়াটি এবং মহাকাশচারীরা কী ধরণের সরঞ্জামে প্রশিক্ষণ নেন তা নিচে দেওয়া হলো:
১. আইএসএস-এর তিনটি প্রধান ব্যায়াম সরঞ্জাম
মহাকাশে ওজন বলতে কিছু না থাকায় সাধারণ ডাম্বেল বা বারবেল অকেজো। প্রকৌশলীদের তাই সেখানে ব্যবহারের জন্য অনন্য কিছু সরঞ্জাম তৈরি করতে হয়েছে:
- ট্রেডমিল (T2 / COLBERT): শূন্য অভিকর্ষে দৌড়ানো অসম্ভব—একবার পা ফেললেই আপনি সিলিংয়ে ছিটকে যাবেন। তাই মহাকাশচারীরা একটি বিশেষ হারনেস বা বেল্ট সিস্টেম পরে দৌড়ান। এই বেল্টটি ইলাস্টিকের টানে দৌড়বিদকে ট্রেডমিলের ওপর চেপে ধরে রাখে, যা তার শরীরের ওজনের অনুকরণ করে। এছাড়া স্টেশনের সংবেদনশীল যন্ত্রপাতির ক্ষতি না করতে এই ট্রেডমিলটি স্প্রিং ও শক-অ্যাবজরবার দিয়ে আলাদাভাবে বসানো থাকে।
- রেজিস্ট্যান্স এক্সারসাইজ ডিভাইস (ARED): এটি বারবেল বা হেভি ওয়েট ট্রেনিংয়ের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। লোহার চাকতির বদলে এতে ভ্যাকুয়াম সিলিন্ডার ও ফ্লাইহুইল ব্যবহার করা হয়। এগুলো দিয়ে কয়েকশ কেজি পর্যন্ত প্রতিরোধ তৈরি করা যায়। এর মাধ্যমে স্কোয়াট বা ডেডলিফ্টের মতো ব্যায়াম করা হয়, যা হাড়ের ঘনত্ব রক্ষায় অত্যন্ত জরুরি।
২. মহাকাশে ব্যায়ামের বিশেষত্ব
মহাকাশে ব্যায়াম করা পৃথিবীর চেয়ে বেশ আলাদা:
- ঘামজনিত সমস্যা: পৃথিবীতে ঘাম নিচে গড়িয়ে পড়ে বা শুকিয়ে যায়। মহাকাশে বাতাস উপরে ওঠে না বলে ঘাম সহজে শুকায় না। এটি ত্বকের ওপর আঠালো বড় ফোঁটার মতো জমে থাকে, যা চোখ বা নাকে ঢুকে যেতে পারে। তাই মহাকাশচারীরা বিশেষ ভেন্টিলেটেড পোশাক পরেন বা সবসময় তোয়ালে সাথে রাখেন।
- পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা: প্রতিটি সেশনের পর সরঞ্জামগুলো অ্যান্টিসেপটিক ওয়াইপস দিয়ে মুছতে হয়। ঘামের ফোঁটা কেবল ব্যাকটেরিয়া ছড়ায় না, বরং ভেন্টিলেশন বা ইলেকট্রনিক্সে ঢুকে শর্ট সার্কিটও ঘটাতে পারে।
আইএসএস-এর মানসম্মত অভিযান:
সাধারণত একটি অভিযান প্রায় ৬ মাস (১৮০ দিন) মেয়াদী হয়। বেশিরভাগ মহাকাশচারী এই সময়টুকুই স্টেশনে কাটান। দীর্ঘতম একক মহাকাশ যাত্রার রেকর্ড: ভ্যালেরি পোলিয়াকভ (রাশিয়া) — মির স্টেশনে **৪৩৭ দিন** (১৯৯৪-১৯৯৫) কাটিয়েছেন। অর্থাৎ তারা এমন ‘কঠোর পরিবেশে’ কেবল ১০ দিনের জন্য নন, বরং দীর্ঘ সময় ধরে থাকেন।
মহাকাশ জীবনের মূল বৈপরীত্য হলো: মানুষ পৃথিবী থেকে যত দূরে যাচ্ছে, তাকে তত বেশি নিজের বর্জ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কক্ষপথে থাকা একজন মহাকাশচারী কেবল গবেষক নন, বরং পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত রিসাইক্লিং ব্যবস্থার একটি জীবন্ত অংশ। যেমনটা মহাকাশচারীরা মজা করে বলে থাকেন: “গতকালের চা-ই হলো আজকের অক্সিজেন।”



