২৬ জুন, ২০২৬ তারিখে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অ্যানথ্রপিকের (Anthropic) চিফ কম্পিউটিং অফিসার টম ব্রাউনকে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে ক্লদ মিথোস ৫ (Claude Mythos 5) মডেলটি ফরচুন ৫০০ তালিকাভুক্ত বড় কোম্পানি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় নিয়োজিত ফেডারেল সংস্থাগুলোর মতো ১০০টিরও বেশি বিশ্বস্ত মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমিতভাবে বিতরণের অনুমতি দেওয়া হয়। ঠিক দুই সপ্তাহ আগে অর্থাৎ ১২ জুন বাণিজ্য মন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা আংশিক প্রত্যাহার করা হলো। সে সময় লুটনিক অ্যানথ্রপিককে তাদের নিজস্ব বিদেশি কর্মীদের পাশাপাশি সব বিদেশি নাগরিকদের জন্য মিথোস ৫ এবং ফেবল ৫ (Fable 5) এর অ্যাক্সেস অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আমাজনের একটি বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। আমাজনের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি জেসি হোয়াইট হাউসকে জানিয়েছিলেন যে, ফেবল ৫-এর সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার একটি পদ্ধতি বা ‘জেলব্রেক’ খুঁজে পাওয়া গেছে। অ্যানথ্রপিক এই দুর্বলতাকে ‘সীমিত ও সার্বজনীন নয়’ বলে দাবি করলেও ট্রাম্প প্রশাসন একে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে। অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই সমস্যাটি সমাধানের জন্য সময় চাইলেও কর্মকর্তাদের মন গলাতে পারেননি। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সরাসরি তাকে বলেছিলেন যে তিনি একটি ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ নিচ্ছেন, এবং এর পরপরই রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়।
গত শুক্রবার রাতে লুটনিকের দেওয়া নতুন অনুমতিতে একটি বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে এই সুবিধা সবার জন্য নয়, বরং বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে চলা নির্দিষ্ট কিছু অংশীদারদের জন্য অ্যাক্সেস পুনর্বহাল করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার ধারণাটি এখন ‘বাছাইকৃত নিয়ন্ত্রণ’ মডেলে রূপান্তরিত হলো। অ্যানথ্রপিকের বিদেশি কর্মী এবং বিশ্বস্ত সংস্থাগুলোর বিদেশি কর্মীরা এখন মিথোস ৫ নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা দুই সপ্তাহের সম্পূর্ণ ব্লকেডের পর একটি বড় অগ্রগতি। তবে ফেবল ৫-এর পাবলিক সংস্করণটি এখনো বন্ধ রাখা হয়েছে। অ্যানথ্রপিক এটি পুনরায় চালু করার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো পাওয়া যায়নি।
এই মডেলটিকে বর্তমানে ‘সবচেয়ে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা’ টুল হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এটি অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যারগুলোর ত্রুটি বা দুর্বলতা শনাক্ত ও ব্যবহার করতে সক্ষম। অ্যানথ্রপিক দাবি করেছে যে, মিথোস প্রিভিউ (Mythos Preview) ইতিমধ্যেই ওপেনবিএসডি (OpenBSD)-এর মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত অপারেটিং সিস্টেমে ২৭ বছরের পুরনো একটি ত্রুটিসহ হাজার হাজার দুর্বলতা খুঁজে বের করেছে। এই সক্ষমতা মডেলটিকে একই সাথে একটি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং অপরাধীদের হাতে সম্ভাব্য মরণাস্ত্রে পরিণত করেছে, যা সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণ ব্যাখ্যা করে।
মিথোস ৫-এর এই ঘটনা ফ্রন্টিয়ার এআই মডেল নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। গত ২ জুন প্রেসিডেন্ট ‘অ্যাডভান্সড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইনোভেশন অ্যান্ড সিকিউরিটি’ শীর্ষক একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। এতে উন্নত মডেল বাজারে ছাড়ার আগে ফেডারেল সরকারের সাথে স্বেচ্ছায় সমন্বয়ের একটি প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছিল। যদিও এই প্রক্রিয়াটি এখনো তৈরির পর্যায়ে রয়েছে (যার সময়সীমা ১ আগস্ট, ২০২৬ পর্যন্ত), প্রশাসন তার নিজস্ব উদ্যোগে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেনি। মিথোস ৫ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করে যে, সমঝোতা এখন আর আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং চাপের মুখেই অর্জিত হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে আলোচনার সদিচ্ছা থাকলেও আস্থার অভাব স্পষ্ট। লুটনিক চিঠিতে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ এবং ‘যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা’র কথা উল্লেখ করেছেন, তবে যেকোনো সময় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের অধিকার নিজের হাতে রেখেছেন। এটি নিষেধাজ্ঞার অবসান নয়, বরং একটি শর্তসাপেক্ষ ও আংশিক পুনর্বহাল। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন কোনো পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো ছাড়াই কোম্পানির ওপর প্রভাব বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে।
মজার বিষয় হলো, ওপেনএআই (OpenAI) যেদিন তাদের জিপিটি-৫.৬ (GPT-5.6) মডেলটি অনুমোদিত অংশীদারদের জন্য সীমিতভাবে উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেয়, সেদিনই এই অনুমতিপত্রটি প্রকাশিত হয়। এই দুটি ঘটনাই মূলত ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি নতুন প্রক্রিয়ার অংশ। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন কার্যত এআই তৈরি ও প্রকাশের প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছে, যদিও একে তারা স্বেচ্ছামূলক সহযোগিতা হিসেবেই দেখাতে চাইছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে অ্যানথ্রপিকের অন্যান্য মডেলের তুলনায় মিথোস সাইবার সংক্রান্ত কাজে অনেক বেশি দক্ষ। ক্লদ ওপাস (Claude Opus) বা সোনেট (Sonnet)-এর মতো সাধারণ মডেলগুলোর তুলনায় মিথোসের ভারসাম্য কিছুটা ভিন্ন। এর সাইবার সক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী হলেও জনসমক্ষে প্রকাশের জন্য এর সুরক্ষা ব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল। একারণেই জুন মাসের আগে অ্যানথ্রপিক কেবল ‘প্রজেক্ট গ্লাসউইং’-এর আওতায় নির্দিষ্ট কিছু অংশীদারকে (যেমন আমাজন ওয়েব সার্ভিসেস, অ্যাপল, গুগল, মাইক্রোসফট, এনভিডিয়া, জেপি মরগান এবং লিনাক্স ফাউন্ডেশন) এটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল। তবে প্রকাশ্য কোনো বেঞ্চমার্ক বা আর্কিটেকচারের বিস্তারিত তথ্য না থাকায় এর প্রকৃত ক্ষমতা ও ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের এই পদ্ধতিটি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষায়িত শিল্পনীতির একটি সংমিশ্রণ বলে মনে হচ্ছে। ওপেনএআই-ও তাদের জিপিটি-৫.৫-সাইবার (GPT-5.5-Cyber) সীমিতভাবে প্রকাশ করেছে, তবে সেটি ছিল তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত, কোনো সরকারি চাপ নয়। ইউরোপ এই পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। যখন ওয়াশিংটন ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন ইউরোপ প্রায় পুরোপুরি মার্কিন নিয়ন্ত্রকদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই নিষেধাজ্ঞাকে এআই প্রযুক্তির বিকল্প উৎসের অভাবের একটি সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে চীন নাটকীয়তা ছাড়াই তাদের দেশীয় ডেভেলপারদের মডেলের ওপর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে।
এআই শিল্পের জন্য এর অর্থ হলো, সরকারি নিয়মকানুন মেনে চলার গতি এখন একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় পরিণত হয়েছে। যে কোম্পানিগুলো দ্রুত সরকারি শর্ত পূরণ করে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারবে, তারা অন্যদের তুলনায় আগে সুবিধা পাবে। সাইবার নিরাপত্তা গবেষকরা একটি শক্তিশালী টুল ব্যবহারের সুযোগ পেলেও তা একটি সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে থাকবে, যা বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা এবং স্বাধীন যাচাইকরণ প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে। ফ্রন্টিয়ার মডেল নির্মাতাদের এখন মডেল রিলিজের পর নয়, বরং তৈরির শুরুতেই নিরাপত্তা ও আইনি বাধ্যবাধকতার পেছনে বিনিয়োগ করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর হবে এবং এই ঘটনা এআই মডেলগুলোর জন্য একটি আনুষ্ঠানিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরির পথ প্রশস্ত করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই সিদ্ধান্তটি একটি মানদণ্ড হিসেবে কাজ করতে পারে। অ্যানথ্রপিক যদি দুই সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা ও শর্তসাপেক্ষ প্রত্যাবর্তনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তবে ওপেনএআই, মেটা বা ভবিষ্যতে আসা নতুন কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও কি একই নিয়ম প্রয়োগ করা হবে? প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং অ্যানথ্রপিকের গতিবিধিই বলে দেবে এই মডেলটি অন্যান্য সিস্টেমের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে এবং উদ্ভাবন ও নিরাপত্তার মধ্যে সত্যিই ভারসাম্য আনা সম্ভব কি না।
পরিশেষে, মিথোস ৫-এর ঘটনাটি উন্নত এআই মডেল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এখন ঢালাও নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে বাছাইকৃত অ্যাক্সেস এবং যাচাইযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। বিমূর্ত নীতিমালার চেয়ে এখন সুনির্দিষ্ট আলোচনা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, যেখানে ওয়াশিংটন একজন সালিশকারীর ভূমিকা পালন করছে। এটি প্রথাগত কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নয়, বরং রাষ্ট্র এবং কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি ‘চোর-পুলিশ’ খেলার মতো, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে নিয়মগুলো নতুন করে লেখা হচ্ছে।


