২০২৫ সালের আগস্টে সূর্য হঠাৎ করেই এমন এক রেডিও সংকেত পাঠাতে শুরু করে যা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ সময়ের জন্য ভাবিয়ে তুলেছিল। শুরুতে ঘটনাটি বেশ সাধারণ বলেই মনে হয়েছিল — এটি ছিল চতুর্থ টাইপের (Type IV) রেডিও বিস্ফোরণ, যা সৌর মানমন্দিরগুলোতে প্রায়ই ধরা পড়ে। যখন শক্তিশালী ইলেকট্রনগুলো চৌম্বকীয় বলরেখা বরাবর চলাচল করে এবং রেডিও তরঙ্গ বিকিরণ করে, তখন এ ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে। সাধারণত এগুলো কয়েক ঘণ্টা বা বড়জোর কয়েক দিন স্থায়ী হয়। কিন্তু এই সংকেতটি থামার কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছিল না।
দিনের পর দিন কাটতে লাগল, প্রথম সপ্তাহ পেরিয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহও পার হয়ে গেল। যখন সংকেতটি অবশেষে স্তিমিত হয়ে এল, ততক্ষণে ঠিক ১৯ দিন পার হয়ে গেছে — যা আগের রেকর্ড করা পাঁচ দিনের দীর্ঘ ইভেন্টের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি দীর্ঘ। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ একটি বিষয় এই দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে এক অস্বাভাবিক রহস্যে পরিণত হয়।
একটি বিরল পরিস্থিতির কারণে এই বিস্ফোরণের প্রকৃতি উন্মোচন করা সম্ভব হয়েছে। সেই সময় সৌরজগতের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অংশে বেশ কয়েকটি মহাকাশযান অবস্থান করছিল: সোলার অরবিটার (ইএসএ এবং নাসা-র যৌথ প্রকল্প), পার্কার সোলার প্রোব, উইন্ড এবং স্টিরিও-এ। তারা বিভিন্ন কোণ থেকে সূর্যের উপর নজর রাখছিল এবং পর্যায়ক্রমে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছিল। সূর্য যখন নিজ অক্ষের ওপর ঘুরছিল, তখন একই সক্রিয় অঞ্চল ধীরে ধীরে দৃশ্যমান চাকতির ওপর সরে যাচ্ছিল এবং প্রতিটি মহাকাশযান সেই একই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা রেকর্ড করছিল। এই সমন্বিত পর্যবেক্ষণের ফলেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছেন যে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো অগ্নুৎপাতের সারি নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী একটি একক ঘটনা।
সংকেতের উৎসটি ছিল একটি বিশাল চৌম্বকীয় কাঠামোর অভ্যন্তরে, যাকে বলা হয় ‘হেলমেট স্ট্রিমার’। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় তোলা ছবিতে সূর্যের করোনা বা বায়ুমণ্ডলে ধনুকের মতো এই অবয়বগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। এই ‘চৌম্বকীয় বোতলে’ শক্তিশালী ইলেকট্রনগুলো আটকা পড়ে গিয়েছিল। একই অঞ্চলে সংঘটিত তিনটি করোনাল মাস ইজেকশন (সিএমই) ক্রমাগত কণার সরবরাহ বজায় রেখেছিল, ফলে বিস্ফোরণটি ম্লান হতে পারেনি। চৌম্বক ক্ষেত্রের ওঠানামা সংকেতটিকে পর্যায়ক্রমে শক্তিশালী ও দুর্বল করে তুলছিল, যা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে একটি নিজস্ব ছন্দ তৈরি করেছিল।
এই আবিষ্কারটি সূর্য সম্পর্কে আমাদের ধারণায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে সূর্যের বায়ুমণ্ডল দীর্ঘ সময় ধরে জটিল চৌম্বকীয় বিন্যাস ধরে রাখতে এবং টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। যা আগে ক্ষণস্থায়ী বলে মনে করা হতো, তা আসলে অনেক বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।
পৃথিবীর জন্য এই রেডিও তরঙ্গগুলো সম্পূর্ণ ক্ষতিকর নয়। তবে এই ধরনের স্থিতিশীল চৌম্বকীয় কাঠামোর সাথে প্রায়ই এমন সব ঘটনা যুক্ত থাকে যা শক্তিশালী চার্জযুক্ত কণার প্রবাহ তৈরি করতে পারে। তাই এই দীর্ঘস্থায়ী বিস্ফোরণগুলোর প্রক্রিয়া বোঝা মহাকাশ আবহাওয়ার মডেল উন্নত করতে সাহায্য করে — যা উপগ্রহ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং চাঁদ ও মঙ্গলে ভবিষ্যৎ মানব অভিযানের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার ফলাফলগুলো অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারস-এ (Astrophysical Journal Letters) প্রকাশিত হয়েছে। উনিশ দিনের এই রেডিও বিস্ফোরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অত্যাধুনিক মহাকাশ মানমন্দিরের যুগেও আমাদের এই নক্ষত্রটি কতটা জটিল ও রহস্যময় রয়ে গেছে। সূর্য একের পর এক নতুন ধাঁধা ছুড়ে দিচ্ছে, আর বিজ্ঞানীরাও সেগুলো সমাধানের পথ খুঁজে বের করছেন।
