সূর্য আমাদের নিকটতম এবং দৃশ্যত সুপরিচিত মহাজাগতিক প্রতিবেশী হলেও এর বায়ুমণ্ডলের মধ্যবর্তী স্তর ক্রোমোস্ফিয়ার এখনো অনেক রহস্য নিজের মাঝে লুকিয়ে রেখেছে। এখানেই ফিব্রিল নামক পাতলা এবং লম্বাটে কাঠামোর জন্ম হয়, যা সুতার মতো সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রগুলোকে যুক্ত করে এবং উপরের স্তরগুলোতে শক্তি পরিবহন করে। এটি ঠিক কীভাবে ঘটে তা বুঝতে পারার অর্থ হলো জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান রহস্য সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছানো: কেন সূর্যের করোনা এর দৃশ্যমান পৃষ্ঠের চেয়ে শতগুণ বেশি উত্তপ্ত।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরির (NSF NSO) বিজ্ঞানীরা এই পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। তারা হাওয়াইয়ের ড্যানিয়েল কে. ইনোয়ে সোলার টেলিস্কোপ থেকে প্রাপ্ত অনন্য তথ্য ব্যবহার করেছেন এবং 'কে-মিনস ক্লাস্টারিং' (K-means clustering) নামক মেশিন লার্নিং পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলগুলো অত্যন্ত চমকপ্রদ: বিজ্ঞানীরা বড় ধরনের কম্পিউটেশনাল সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে ক্রোমোস্ফিয়ারের তাপমাত্রা, ঘনত্ব এবং প্লাজমা প্রবাহের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
কল্পনা করুন, সূর্যের ক্রোমোস্ফিয়ার হলো তপ্ত গ্যাসের এক উত্তাল সমুদ্র, যা চৌম্বক ক্ষেত্র দিয়ে ঘেরা। ফিব্রিলগুলো চৌম্বক ক্ষেত্রের আনুভূমিক রেখা অনুসরণ করে হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। আগে টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া বর্ণালী তথ্য বিশ্লেষণ করে ভৌত মানদণ্ডে (তাপমাত্রা, গতি, ঘনত্ব) রূপান্তর করতে জটিল 'নন-এলটিই' (non-LTE) গণনার প্রয়োজন হতো—যেখানে বায়ুমণ্ডলের প্রতিটি স্তরে বিকিরণ কীভাবে পরমাণুর সাথে যোগাযোগ করে তা বিবেচনা করতে হয়। এই ধরনের গণনা অত্যন্ত শক্তিশালী কম্পিউটারেও অনেক বেশি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল।
ডঃ সঞ্জয় গোসেইনের নেতৃত্বাধীন দলটি একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল অবলম্বন করেছেন। কে-মিনস অ্যালগরিদম ক্যালসিয়াম লাইনের (Ca II 854.2 nm) পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত হাজার হাজার স্বতন্ত্র বর্ণালী প্রোফাইলকে মাত্র ৫০টি 'আদর্শ' গ্রুপে বিভক্ত করেছে। এই প্রোফাইলগুলো পরবর্তী বিশ্লেষণের জন্য চমৎকার সূচনা বিন্দু হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং প্রাপ্ত মানচিত্রগুলো অনেক বেশি নির্ভুল ও সুসংগত হয়েছে।
সেখানে ঠিক কী দেখা গেছে? একটি ফিব্রিলের দৈর্ঘ্য বরাবর দেখা যায় যে, পৃষ্ঠের কাছে থাকা উত্তপ্ত 'পাদদেশ' থেকে মাঝখানের দিকে তাপমাত্রা প্রায় ১০০০ কেলভিন হ্রাস পায়। এর প্রান্তগুলোতে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ সীমানা বিদ্যমান: মাত্র এক মেগামিটারের ব্যবধানে তাপমাত্রা কয়েকশ ডিগ্রি কমে যেতে পারে। এটি নির্দেশ করে যে ফিব্রিলগুলো চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন এবং আশেপাশের সাথে এদের তাপের আদান-প্রদান প্রায় হয় না বললেই চলে। অপেক্ষাকৃত ঘন এবং শীতল অংশগুলোতে সাধারণত নিম্নগামী প্লাজমা প্রবাহ দেখা যায়—মনে হয় যেন পদার্থগুলো আবার পৃষ্ঠের দিকে ঝরে পড়ছে। অন্যদিকে, উত্তপ্ত অঞ্চলগুলো মাইক্রো-টার্বুলেন্সে পূর্ণ—যা তরঙ্গ বা শক প্রক্রিয়ার লক্ষণ এবং সম্ভবত এটিই বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে তোলে।
এই পর্যবেক্ষণগুলো তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীদের গাণিতিক মডেলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা বা 'কনস্ট্রেইন্টস' প্রদান করে। এখন ফিব্রিল কীভাবে তৈরি হয় এবং কীভাবে তারা ভর ও শক্তি পরিবহন করে তা আরও নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হবে। ইনোয়ে টেলিস্কোপের তথ্যের সাথে মেশিন লার্নিংয়ের এই সমন্বয় ভবিষ্যতে বিশাল পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণের পথ প্রশস্ত করেছে।
সূর্য আমাদের বারবার অবাক করে চলেছে। প্রতিটি নতুন প্রযুক্তি এবং অ্যালগরিদম আমাদের নক্ষত্রের জীবনযাত্রা এবং পৃথিবীর ওপর এর প্রভাব বোঝার আরও কাছে নিয়ে যায়। এটি কেবল শুরু মাত্র—সূর্যের বায়ুমণ্ডলের এই গতিশীল এবং রহস্যময় জগতে আরও অনেক আবিষ্কার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
