কল্পনা করুন: আপনার কোষের ভেতরে, বাস্তবের সেই 'শক্তিঘর' বা মাইটোকন্ড্রিয়াতেই বাস করছে... অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া। এটি যেন জীবনের এক সত্যিকারের একের ভেতর এক সাজানো জগত।
মাইটোকন্ড্রিয়া অনেক আগে থেকেই প্রাচীন ব্যাকটেরিয়ার বংশধর হিসেবে পরিচিত, যারা কোটি কোটি বছর আগে আদি ইউক্যারিওটিক কোষের সাথে একটি বিশেষ চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু ২১ মে Communications Biology সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে যে, এই মৈত্রীর ইতিহাস সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি।
বিজ্ঞানীরা কিছু ইউক্যারিওটিক প্রাণীর (বিশেষ করে এটেল পোকা এবং সামুদ্রিক প্রোটিস্টদের) মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরেই নিশ্চিন্তে বসবাসকারী জীবন্ত ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন। এরা কোষের ভেতরে কেবল সাধারণ 'অতিথি' নয়, বরং এরা দ্বিতীয় স্তরের বাসিন্দা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো মাইটোকন্ড্রিয়ার ক্রিস্টিগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে প্রবেশ করে এবং ধারণা করা হচ্ছে যে, তারা কেবল পরজীবী হিসেবে নয় বরং কোষের বিপাক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।
এই আবিষ্কার আমাদের প্রচলিত ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, একটি কোষীয় অঙ্গাণু যা একসময় নিজেই একটি স্বাধীন ব্যাকটেরিয়া ছিল, সেটি এখন নতুন অণুজীব 'বাসিন্দাদের' আবাসে পরিণত হয়েছে। সত্যিই এক জীবন্ত রুশ পুতুলের কারসাজি!
মাইক্রোবায়োম সংক্রান্ত অধিকাংশ গবেষণাই মূলত অন্ত্র বা ত্বকের স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এখানে দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে কয়েক ধাপ গভীরে, সরাসরি কোষের হৃৎপিণ্ডে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মাইটোকন্ড্রিয়ার অভ্যন্তরের এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শক্তি উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে, যদিও মানুষের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণিত ঘটনা পাওয়া যায়নি।
বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অবিশ্বাস্য রকমের চমকপ্রদ। দেড় থেকে দুই বিলিয়ন বছর পার হওয়ার পরও কোষের গঠনগুলো এখনও নমনীয় এবং নতুন নতুন জোট গঠনের জন্য উন্মুক্ত রয়ে গেছে। অণুজীব জগতে 'নিজস্ব' এবং 'বাইরের' সত্তার মধ্যকার সীমানা ক্রমাগত অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা যাকে 'কোষ' বলি, তা আসলে একটি জটিল বহু-প্রজাতিভিত্তিক সম্প্রদায়, যেখানে সবাই সবার ভেতরে এবং একে অপরের পরিপূরক হয়ে বাস করে।
এই আবিষ্কার আমাদের নিজেদের কোষগুলোকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। আমরা স্রেফ চলন্ত কোনো 'কারখানা' নই, বরং একেকটি জীবন্ত মহাবিশ্ব, যেখানে মিথোজীবিতার সেই প্রাচীন খেলা আজও অব্যাহত রয়েছে।
আর কে জানে, আরও গভীরে কতসব অজানা জগত লুকিয়ে আছে?




