জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ কীভাবে 'সিগার' গ্যালাক্সির লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রকে উন্মোচন করল

লেখক: Uliana S

মহাকাশ বিজ্ঞানের জগতে এম৮২ গ্যালাক্সিটি দীর্ঘকাল ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে। একে অনেকে 'সিগার গ্যালাক্সি' নামেও চেনেন। পৃথিবী থেকে প্রায় ১২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই গ্যালাক্সিটি তার অদ্ভুত গঠন এবং প্রচণ্ড সক্রিয়তার জন্য পরিচিত। সম্প্রতি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এবং হাবল টেলিস্কোপের সংগৃহীত তথ্যের সমন্বয়ে এই গ্যালাক্সির এক অভূতপূর্ব ও বিস্তারিত চিত্র সামনে এসেছে। এই নতুন পর্যবেক্ষণ আমাদের মহাবিশ্বের গভীর রহস্য উন্মোচনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে, যা আগে কখনও সম্ভব হয়নি।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের এনআইআর-ক্যাম যন্ত্রটি ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রায় ৬৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এম৮২ গ্যালাক্সিটি পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই ইনফ্রারেড প্রযুক্তির সাহায্যে ঘন ধূলিকণা এবং গ্যাসের আস্তরণ ভেদ করে গ্যালাক্সির অভ্যন্তরে উঁকি দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যা আগে সাধারণ দৃশ্যমান আলোতে সীমাবদ্ধ ছিল। এই পর্যবেক্ষণে প্রায় ১৬.৫ মিলিয়ন পৃথক নক্ষত্র শনাক্ত করা হয়েছে। যদিও এটি গ্যালাক্সির মোট নক্ষত্র সংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, তবুও এই সংখ্যাটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। ছবিতে নক্ষত্রগুলোকে উজ্জ্বল নীল দানার মতো দেখায় এবং গ্যালাক্সির ডিস্কটি কিছুটা অপ্রতিসম ও প্রসারিত বলে মনে হয়, যা এর অভ্যন্তরে চলমান অস্থির প্রক্রিয়ারই ফল।

এম৮২ গ্যালাক্সিকে একটি আদর্শ স্টারবার্স্ট গ্যালাক্সি হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে নক্ষত্র তৈরির হার আমাদের নিজস্ব মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি। বিজ্ঞানীদের মতে, অতীতে অন্য একটি গ্যালাক্সির সাথে সংঘর্ষ বা মিলনের ফলে এই ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, যা নক্ষত্র তৈরির এই বিশাল প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সময়কাল অনুযায়ী এই পর্যায়টি খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে না, বড়জোর কয়েকশ মিলিয়ন বছর। নক্ষত্র তৈরির এই প্রচণ্ড গতির কারণে গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে আয়নিত গ্যাস এবং ধূলিকণার বিশাল নিঃসরণ ঘটছে, যা সময়ের সাথে সাথে নক্ষত্র গঠনের প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে।

হাবল এবং জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের তথ্যের এই মেলবন্ধন অত্যন্ত মূল্যবান। হাবল টেলিস্কোপ যেখানে দৃশ্যমান আলোতে গ্যাস ও ধূলিকণার গঠন স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল, সেখানে জেমস ওয়েব গ্যালাক্সির গভীরে প্রবেশ করে নক্ষত্রপুঞ্জ এবং ডিস্কের বিকৃত রূপটি উন্মোচন করেছে। গবেষকরা এম৮২ গ্যালাক্সিকে একটি সুন্দর বিশৃঙ্খলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এখানে একই সাথে গ্যালাক্সি গঠনের ইতিহাস এবং বর্তমানের সক্রিয় প্রক্রিয়াগুলো পরিলক্ষিত হয়। এর ডিস্কের অপ্রতিসমতা এবং উভয় পাশের ব্যাসার্ধের পার্থক্য এম৮২-এর অতীত সম্পর্কে নতুন নতুন সূত্র প্রদান করছে যা বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এই গ্যালাক্সিটি একটি আদর্শ গবেষণাগার বা ল্যাবরেটরি হিসেবে কাজ করে। গ্যালাক্সিগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া কীভাবে নক্ষত্র গঠনে প্রভাব ফেলে, চরম প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যু ঘটে এবং গ্যাস নিঃসরণ কীভাবে একটি পুরো সিস্টেমের বিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা এখানে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। জেমস ওয়েবের নতুন তথ্যগুলো পূর্ববর্তী গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে এবং বিজ্ঞানীদের মনে আরও জটিল ও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতে মহাকাশ গবেষণার পথকে আরও সুগম করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ থেকে প্রাপ্ত প্রতিটি নতুন ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্ব কতটা বৈচিত্র্যময় এবং রহস্যময়। আমাদের তুলনামূলক কাছের এই সিগার গ্যালাক্সি রাতের আকাশে তার রহস্যগুলো একে একে উন্মোচন করে চলেছে। মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো কীভাবে টিকে থাকে এবং সময়ের সাথে সাথে কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রে এম৮২ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই নতুন তথ্যগুলো মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে এবং আমাদের জ্ঞানের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছে।

6 দৃশ্য

এই বিষয়ে আরও নিবন্ধ পড়ুন:

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।