আকাশগঙ্গার হৃদপিণ্ডে কৃষ্ণগহ্বরের নিঃশ্বাস

লেখক: Uliana S

আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থলে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল Sagittarius A* একটি উষ্ণ মহাজাগতিক হাওয়া নির্গত করছে — এমন কিছু যা বৈজ্ঞানিকরা 50 বছর ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

পৃথিবীর থেকে প্রায় ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে আমাদের ছায়াপথের ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত একটি অতিদানবীয় কৃষ্ণগহ্বর, যার নাম ধনু এ* (Sagittarius A* বা Sgr A*)। কোটি কোটি বছর ধরে এই কৃষ্ণগহ্বরটি অনেকটা শান্তভাবেই 'ঘুমিয়ে' আছে, মাঝে মাঝে মহাজাগতিক গ্যাসের সামান্য অংশ গিলে ফেলে। দীর্ঘদিনের তাত্ত্বিক ধারণা ছিল যে, কৃষ্ণগহ্বর যখন এভাবে গ্যাস গ্রহণ করে, তখন সেটি কেবল পদার্থ গিলে নেয় না, বরং শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহের মতো করে এর কিছু অংশ বাইরেও ছুড়ে দেয়। তবে আমাদের ছায়াপথের এই কৃষ্ণগহ্বরের ক্ষেত্রে এমন ঘটনার সরাসরি কোনো প্রমাণ এতদিন পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি আলমা (ALMA) রেডিও টেলিস্কোপ এবং চন্দ্র (Chandra) এক্স-রে অবজারভেটরির পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীদের সামনে এই দানবীয় কৃষ্ণগহ্বরের 'নিশ্বাস' নেওয়ার দৃশ্যটি ধরা পড়েছে।

গবেষক মার্ক গোর্স্কি এবং লেনা মুরচিকোভা কয়েক বছর ধরে ১.৩ মিলিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আলমা টেলিস্কোপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তারা মূলত কার্বন মনোক্সাইড (CO) অণুর বিকিরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন, যা কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের কয়েক আলোকবর্ষ বা প্রায় এক পারসেক এলাকার শীতল আণবিক গ্যাসের একটি নির্ভরযোগ্য নির্দেশক। এই কাজটি মোটেও সহজ ছিল না, কারণ ধনু এ* নিজেই রেডিও তরঙ্গে অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং এর দ্রুত পরিবর্তনশীল বিকিরণ চারপাশের গ্যাসের দুর্বল সংকেতগুলোকে ঢেকে দেয়। এই সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানীদের জটিল গাণিতিক মডেলিং এবং ব্যাকগ্রাউন্ড সিগন্যাল বাদ দেওয়ার বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হয়েছে।

গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। নতুন মানচিত্রটি আগের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি সংবেদনশীল এবং ৮০ গুণ বেশি রেজোলিউশন সম্পন্ন। এই মানচিত্রে শীতল গ্যাসের মধ্যে একটি বিশাল শঙ্কু আকৃতির গহ্বর বা 'শূন্যস্থান' স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, যা সরাসরি কৃষ্ণগহ্বর থেকে বাইরের দিকে প্রসারিত। যেখানে শীতল গ্যাস অনুপস্থিত ছিল, চন্দ্র টেলিস্কোপের তথ্যে সেখানে উত্তপ্ত এক্স-রে গ্যাসের উপস্থিতি দেখা গেছে। এটি একটি সক্রিয় মহাজাগতিক বায়ুপ্রবাহের ধ্রুপদী চিহ্ন। কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশ থেকে বেরিয়ে আসা এই উত্তপ্ত প্রবাহ হয় শীতল পদার্থগুলোকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, অথবা সেগুলোকে এতটাই উত্তপ্ত করছে যে রেডিও টেলিস্কোপে তা আর ধরা পড়ছে না।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই বায়ুপ্রবাহ অন্তত ২০ হাজার বছর ধরে বইছে। অন্যান্য সক্রিয় ছায়াপথের শক্তিশালী জেটের তুলনায় এটি কিছুটা দুর্বল হলেও, আমাদের ছায়াপথের শান্ত কেন্দ্রের জন্য এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই আবিষ্কারটি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে যে, কীভাবে একটি অতিদানবীয় কৃষ্ণগহ্বর গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং নক্ষত্র গঠন থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় অঞ্চলের গতিশীলতা পর্যন্ত চারপাশের মহাজাগতিক বিবর্তনে প্রভাব ফেলে।

দীর্ঘ বছরের কঠোর পরিশ্রম এবং তথ্য বিশ্লেষণের উদ্ভাবনী কৌশলের ফসল হলো এই আবিষ্কার। এটি অর্ধশতাব্দী পুরনো একটি রহস্যের সমাধান করেছে এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের 'সুপ্ত' কৃষ্ণগহ্বরগুলোর আচরণ বোঝার জন্য একটি নতুন হাতিয়ার প্রদান করেছে। এখন আমরা আকাশগঙ্গার হৃদপিণ্ডে ঠিক কী ঘটছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলাম। সেখানে এই দানবীয় কৃষ্ণগহ্বরের শান্ত 'নিশ্বাস' কীভাবে চারপাশের মহাকাশকে নতুন রূপ দিচ্ছে, তা এখন আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট।

এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারস (The Astrophysical Journal Letters) সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে, যার রেফারেন্স নম্বর হলো arXiv:2509.10615।

15 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।