একদল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী সেই প্রক্রিয়াটি উন্মোচন করেছেন যার মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে অ্যান্টার্কটিকায় একটি শক্তিশালী বরফের স্তর তৈরি হয়েছিল, যখন পৃথিবীর তাপমাত্রা বর্তমানের চেয়ে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল; অথচ উত্তর গোলার্ধে বড় আকারের বরফের স্তর দেখা দেয় মাত্র ৫০ লক্ষ বছর আগে।
সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টমাস গার্ননের নেতৃত্বে এবং ডারহাম ইউনিভার্সিটি, জিএফজেড হেলমহোল্টজ, পটসডাম ইউনিভার্সিটি, ইউট্রেখ্ট ইউনিভার্সিটি ও ফ্লোরেন্স ইউনিভার্সিটির গবেষকদের সহযোগিতায় ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণাটি গত ১০ কোটি বছরে পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার ভূপ্রকৃতির বিবর্তনের কম্পিউটার মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আজ থেকে ২০ কোটি ১০ লক্ষ থেকে ১৪ কোটি ৩০ লক্ষ বছর আগে জুরাসিক যুগে অ্যান্টার্কটিকা ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী ফাটলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই প্রক্রিয়ার ফলে ‘ম্যান্টেল ওয়েভ’ বা ভূ-অভ্যন্তরীণ ধীরপ্রবাহের সৃষ্টি হয় যা মহাদেশীয় ভূত্বকের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ধীরে ধীরে পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার উপরিভাগকে ওপরে ঠেলে দেয়।
এর ফলে, প্রায় ৪ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগে এই অঞ্চলের একটি বড় অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ কিলোমিটারের বেশি উচ্চতায় উঠে আসে। ঠিক এই উচ্চতাতেই তুষার ও বরফ গ্রীষ্মকালেও না গলে সারা বছর টিকে থাকতে পারত এবং ধীরে ধীরে জমা হয়ে প্রথমে পার্বত্য হিমবাহ এবং পরে একটি অখণ্ড বরফের স্তরে পরিণত হতে শুরু করে।
গবেষকরা বিশেষভাবে কুইন মড ল্যান্ডের প্রায় ২ কিলোমিটার উঁচু উপকূলীয় খাড়া ঢাল, বিশাল মালভূমি এবং বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা গ্যামবুর্টসেভ পর্বতমালায় নজর দিয়েছেন। মডেলগুলো দেখায় যে, তুষারপাত ও বরফ জমার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময় নাগাদ এই পর্বতশ্রেণির প্রায় অর্ধেক অংশই ২ কিলোমিটারের বেশি উঁচু ছিল, যা বরফ স্থায়ীভাবে জমে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করেছিল।
বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, কেবল বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমে যাওয়া দিয়ে এই অসমতা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়: যদি শুধুমাত্র কার্বন ডাই-অক্সাইডই মূল কারণ হতো, তবে দুই মেরুতেই প্রায় একই সময়ে বরফ জমার কথা ছিল। এই ভৌগোলিক উচ্চতা বৃদ্ধিই অ্যান্টার্কটিকাকে এক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।
বরফের স্তর বিস্তৃত হওয়ার সাথে সাথে ‘অ্যালবেডো এফেক্ট’ বা প্রতিফলন প্রভাব কাজ করতে শুরু করে: বরফের উজ্জ্বল উপরিভাগ সূর্যের আলো বেশি প্রতিফলিত করার ফলে অঞ্চলটি আরও শীতল হয়ে ওঠে। এছাড়া, শীতল বাতাস কম জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারায় গ্রিনহাউস প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাপমাত্রা আরও হ্রাসে সহায়তা করে।
সে সময় সুমেরু বা আর্কটিক অঞ্চলে এ ধরনের কোনো উঁচু মালভূমি বা পর্বতমালা ছিল না, ফলে সামগ্রিক তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও সেখানে অনেক পরে না হওয়া পর্যন্ত বড় আকারের বরফের স্তর গড়ে ওঠেনি।
গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলোই ভূপ্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয়, যা জলবায়ুর বড় ধরনের পরিবর্তনকে হয় সহজ করে তোলে নতুবা বাধাগ্রস্ত করে। এই আবিষ্কার শুধু প্রাচীন তুষারযুগ বুঝতে সাহায্য করে না, বরং আধুনিক জলবায়ু ব্যবস্থার সম্ভাব্য পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণগুলো সম্পর্কেও ধারণা দেয়।
এই গবেষণাটি ভৌগোলিক পুনর্গঠন, সিসমিক বা ভূকম্পন সংক্রান্ত উপাত্ত এবং গাণিতিক মডেলিংয়ের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যা বর্তমান পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ফলাফলগুলোকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে।
