প্রতি বছর অবৈধ পাচার থেকে উদ্ধার করা হাজার হাজার তোতাপাখি লাতিন আমেরিকার বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই পায়। এদের মধ্যে অনেক পাখিই বন্য পরিবেশে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে চিরকাল বন্দি অবস্থায় থেকে যায়। তবে নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, সঠিক বয়সে 'ফ্রি-ফ্লাইট' বা মুক্ত উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে প্রকৃতিতে এদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
'বার্ড কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল' নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণাটি টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি, বার্ড রিকভারি ইন্টারন্যাশনাল এবং ফান্ডাসিওন লোরোসের বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন। তারা ১৮টি 'ইয়েলো-ক্রাউনড আমাজন' তোতাপাখি নিয়ে কাজ করেছেন, যেগুলোকে ছানা থাকা অবস্থাতেই জব্দ করা হয়েছিল। এই পাখিদের মুক্ত উড্ডয়ন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, যা তাদের এমন এক সময়ে দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করে যখন বন্য পরিবেশে তোতাপাখির ছানারা সাধারণত বাসা ছেড়ে বের হয়।
প্রচলিত পুনর্বাসন কর্মসূচিগুলোতে সাধারণত পাখিদের পূর্ণবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত খাঁচায় আটকে রাখা হয়। এই দীর্ঘ সময়ে তাদের মধ্যে এমন কিছু অভ্যাস তৈরি হয় যা খাঁচায় কার্যকর হলেও বনে তাদের জন্য নিরর্থক বা এমনকি বিপজ্জনক হতে পারে। মুক্ত উড্ডয়ন পদ্ধতি এই সমস্যার ভিন্নভাবে সমাধান করে: পাখিরা যখন অল্পবয়সী এবং শেখার প্রতি আগ্রহী থাকে, তখনই তাদের দীর্ঘ উড্ডয়ন, দিকনির্ণয় এবং ঝাঁকবদ্ধ জীবনযাপনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়ার পর দেখা গেছে, ১৮টি পাখির সবকটিই নিয়মিত ফিডার বা খাবারের পাত্র ব্যবহার করেছে এবং নিজেদের সংহতি বজায় রেখে নির্দিষ্ট এলাকার কাছেই অবস্থান করেছে। এক মাস পর ৯৪ শতাংশ পাখি খাবারের সন্ধানে ফিরে এসেছিল, তিন মাস পর এই হার ছিল ৮৯ শতাংশ এবং এক বছর পর ৭২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে যে, অধিকাংশ পাখিই নতুন বন্য পরিবেশের সাথে সফলভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছে।
এই সাফল্যের পেছনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফাউন্ডেশনের কর্মীরা স্কুলে সচেতনতামূলক পাঠদান করেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্য প্রচার করেছেন এবং সাধারণ মানুষকে এই পাখিদের দেখা গেলে তা জানানোর অনুরোধ করেছেন। এর ফলে বিপদে পড়া দুটি পাখিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং মানুষের সাথে পাখিদের নেতিবাচক সংঘাতের ঝুঁকিও হ্রাস পেয়েছে।
এই পদ্ধতিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি একই সাথে উড্ডয়ন, খাবার খোঁজা, শিকারি প্রাণী শনাক্ত করা এবং পথ চেনার মতো বিভিন্ন দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করে। আলাদা আলাদা প্রশিক্ষণের পরিবর্তে এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক শিক্ষা পদ্ধতিকেই অনুকরণ করে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, ঝাঁকের মধ্যকার সামাজিক বন্ধন তরুণ পাখিদের টিকে থাকতে সাহায্য করে; কারণ দলবদ্ধ থাকলে শিকারি প্রাণীদের পক্ষে আক্রমণ করা কঠিন হয়।
এই প্রকল্পের সাফল্য অন্যান্য প্রজাতির পাখি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিয়েছে। গবেষকরা আশা করছেন এই পদ্ধতিটি ছোট আকারের তোতাপাখি এবং অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সী পাখিদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে 'প্যারাট রিলিজ নেটওয়ার্ক' বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ বিশেষজ্ঞকে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যে একটি প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করেছে।
গবেষণাটি প্রমাণ করেছে যে, উদ্ধারকৃত পাখিদের সঠিক সময়ে এবং যথাযথ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিলে পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর উপচে পড়া ভিড়ের সমস্যাটিই পক্ষান্তরে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধির সুযোগে রূপান্তরিত হতে পারে। এটি কেবল কয়েকটি প্রাণীকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা নয়, বরং কোনো এলাকা থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রজাতিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।
মূল কথাটি হলো: যদি পাখিদের সঠিক সময়ে এবং উপযুক্ত পরিবেশে শেখার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তাদের অনেকের পক্ষেই বন্য পরিবেশে সার্থকভাবে ফিরে যাওয়া সম্ভব।

