লেন্সের নিচে চৌম্বক ঢাল: ইউরোপ ও চীন কেন মহাকাশে ‘স্মাইল’ মিশন পাঠাচ্ছে

লেখক: Svitlana Velhush

লেন্সের নিচে চৌম্বক ঢাল: ইউরোপ ও চীন কেন মহাকাশে ‘স্মাইল’ মিশন পাঠাচ্ছে-1

পৃথিবী প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য আক্রমণের শিকার হচ্ছে। সৌরঝড় বা চার্জযুক্ত কণার প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে শত শত কিলোমিটার বেগে অবিরাম আমাদের গ্রহকে আক্রমণ করছে। আমাদের চৌম্বক ক্ষেত্র একটি অদৃশ্য ঢাল হিসেবে কাজ করে এই আঘাতগুলো নিজের ওপর টেনে নিয়ে আমাদের রক্ষা করে। তবে সূর্যের সক্রিয়তা যখন হঠাৎ তীব্রভাবে বেড়ে যায়, তখন কী ঘটে? শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়গুলো নিমেষেই স্যাটেলাইট নেভিগেশন অচল করে দিতে পারে, রেডিও যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এবং ভূপৃষ্ঠের বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে বিকল করে দিতে পারে।

এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মহাকাশের নির্দিষ্ট কিছু বিন্দুতে প্রোব পাঠিয়ে এই সংঘাতকে কেবল আংশিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। আমরা এতদিন মোজাইকের কেবল খণ্ডাংশগুলোই দেখতে পেতাম। কিন্তু পুরো চিত্রটি কি একসাথে দেখা সম্ভব?

ঠিক এই লক্ষ্য পূরণেই কাজ করছে ‘স্মাইল’ (SMILE - Solar wind Magnetosphere Ionosphere Link Explorer) মিশন, যা ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA) এবং চীনা একাডেমি অফ সায়েন্সেস (CAS)-এর একটি যৌথ প্রকল্প। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি বৃহৎ পরিসরের প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের এক বিরল দৃষ্টান্ত। ইউরোপীয় আরিয়ান ৬ (Ariane 6) রকেটের মাধ্যমে ফরাসি গায়ানার কুরু মহাকাশ কেন্দ্র থেকে এই মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো একটি দীর্ঘায়িত মেরু কক্ষপথে পৌঁছানো, যেখান থেকে পৃথিবীর ম্যাগনেটোস্ফিয়ারের সীমানা অভূতপূর্বভাবে দেখা সম্ভব হবে।

এই মিশনের অনন্যতা নিহিত এর যন্ত্রপাতির মধ্যে। স্মাইল মিশনে একটি সফট এক্স-রে টেলিস্কোপ (SXI) যুক্ত করা হয়েছে। যখন সৌরঝড় পৃথিবীর এক্সোস্ফিয়ারের নিরপেক্ষ পরমাণুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন চার্জের আদান-প্রদান ঘটে যা এক্স-রে বিকিরণ তৈরি করে। এই স্যাটেলাইটটি সেই প্রক্রিয়াটি ধারণ করবে, যা কার্যত সৌর প্লাজমার সাথে পৃথিবীর চৌম্বক ঢালের মিথস্ক্রিয়ার ইতিহাসে প্রথম নিরবচ্ছিন্ন ভিডিও চিত্র তৈরি করবে।

জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান থেকে দূরে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য এই মিশনের গুরুত্ব আসলে কী?

আমাদের সমাজ বর্তমান যুগে মাইক্রোইলেক্ট্রনিক্স এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। স্মাইল মিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য মহাকাশ আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মডেলগুলোকে আরও নিখুঁত করতে সহায়তা করবে। সঠিক পূর্বাভাস পেলে টেলিকম অপারেটর, বিমান সংস্থা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে। এটি ব্যাপক ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি কমাবে এবং কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটগুলোর আয়ু বাড়াবে, যার ওপর আমাদের প্রতিদিনের ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং পরিষেবা নির্ভর করে।

স্মাইল মিশন কেবল নিকট মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানই বাড়াচ্ছে না। এটি মহাকাশীয় হুমকি মোকাবিলায় একটি বিশ্বব্যাপী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করছে, যা সূর্যের খেয়ালি আচরণের মুখে মানবজাতির প্রযুক্তিগত অবকাঠামোকে আরও সহনশীল করে তুলবে।

22 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Solar Wind Magnetosphere Ionosphere Link Explorer

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।