হৃদপিণ্ড নিজে নিজে স্পন্দিত হয় না—ডান অলিন্দে থাকা সাইনোঅ্যাট্রিয়াল নোড নামক কোষের একটি ক্ষুদ্র গুচ্ছ এর কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে। এটি বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে অঙ্গটিকে একটি নির্দিষ্ট গতিতে সংকুচিত হতে বাধ্য করে। যখন এই নোডটি অকেজো হয়ে যায়, তখন মানুষ জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ অ্যারিথমিয়া বা হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতার সম্মুখীন হয়। এখন পর্যন্ত ধাতব পেসমেকারই ছিল এর একমাত্র নির্ভরযোগ্য সমাধান। কিন্তু জীবন্ত কোষ থেকে কি এই জটিল প্রক্রিয়াটি পুনরায় তৈরি করা সম্ভব?
সাংহাই ইনস্টিটিউট অফ বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড সেল বায়োলজির একদল গবেষক এই লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। মানুষের প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো পেট্রি ডিশে কেবল স্পন্দিত টিস্যুই নয়, বরং সাইনোঅ্যাট্রিয়াল নোডের একটি পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক অর্গানয়েড তৈরি করেছেন। 'Cell Stem Cell' জার্নালে প্রকাশিত তাদের এই গবেষণায় তথাকথিত 'জৈবিক পেসমেকার' তৈরির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
মূল চ্যালেঞ্জটি কেবল কোষগুলোকে সংকুচিত করা ছিল না। কিন্তু তাদের কীভাবে স্নায়ুতন্ত্রের নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য করা যাবে? জীবন্ত শরীরে মস্তিষ্কের সংকেত দ্বারা হৃদস্পন্দনের হার প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রিত হয়। এই প্রক্রিয়াটির অনুকরণ করতে সাংহাইয়ের বিজ্ঞানীরা পেসমেকার অর্গানয়েডের সাথে নিউরন সমৃদ্ধ একটি কৃত্রিম গ্যাংলিওনিক প্লেক্সাস বা স্নায়ুসংযোজক যুক্ত করেছেন।
পরীক্ষাটি সফল হয়েছে: স্নায়ুতন্তুগুলো কৃত্রিম নোডের ভেতরে নিজে থেকেই বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আণবিক সংকেতের মাধ্যমে এর স্পন্দনের হার নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে, যা হুবহু প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মতোই কার্যকর।
বিজ্ঞানীদের কেন এমন সূক্ষ্ম কাঠামোর প্রয়োজন পড়ল? ইঁদুরের ওপর হৃদস্পন্দনের সমস্যা নিয়ে গবেষণা করা খুব একটা ফলপ্রসূ নয়—তাদের হৃদপিণ্ড খুব দ্রুত স্পন্দিত হয়, আর মানুষের জীবন্ত সাইনোঅ্যাট্রিয়াল নোডের নমুনা সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব। নতুন এই ত্রিমাত্রিক 'স্নায়ু-নোড-অলিন্দ' মডেলটি গবেষকদের গবেষণাগারেই জিনগত অ্যারিথমিয়া পুনর্নির্মাণ করার সুযোগ করে দিয়েছে। একটি নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে তারা হৃদস্পন্দন ধীর হতে দেখেন এবং এরপর সফলভাবে পটাশিয়াম চ্যানেল ব্লকার পরীক্ষা করেন, যা স্পন্দনকে পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
তবে এর অর্থ কি এই যে ত্বকের নিচে টাইটানিয়াম যন্ত্র ব্যবহারের যুগ শেষ হতে চলেছে? এখনই নয়। এই ধরণের জৈবিক কাঠামো প্রকৃত রোগীদের শরীরে প্রতিস্থাপন করার আগে কোষের দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকা থেকে শুরু করে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কর্তৃক প্রত্যাখ্যান রোধ পর্যন্ত নিরাপত্তার অনেক দিক নিয়ে কাজ করতে হবে। তা সত্ত্বেও, প্রযুক্তিগত ভিত্তিটি স্থাপিত হয়েছে। উদ্ভাবিত এই প্ল্যাটফর্মটি ইতিমধ্যেই গবেষকদের মানুষের টিস্যুতে অ্যারিথমিয়ার নতুন ওষুধ পরীক্ষা করার সুযোগ দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতের ব্যক্তিগত চিকিৎসা পদ্ধতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করবে।




