২০২৬ সালের ১৫ থেকে ২১ জুন পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের মেস বাসেল প্রদর্শনী কেন্দ্রে সমসাময়িক তরুণ শিল্পের অন্যতম প্রভাবশালী মেলা ‘লিস্টে আর্ট ফেয়ার বাসেল ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বছর ৩৬টি দেশের ১০৬টি গ্যালারি এতে অংশ নিয়েছে, যারা সমসাময়িক শিল্পের ভাষা তৈরিকারী নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতিনিধিত্ব করছে। গত তিন দশক ধরে এই মেলা থেকেই এমন সব শিল্পীদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, যারা পরবর্তীতে বিশ্বের বড় বড় প্রদর্শনী ও জাদুঘরের সংগ্রহে স্থান করে নিয়েছেন। তবে এবারের মেলায় শত শত কাজের ভিড়ে সমালোচকদের নজর কেড়েছে বড় কোনো কারিগরি প্রকল্প নয়, বরং সেই সব সৃষ্টি যা মানুষের ঘনিষ্ঠতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানবিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছে।
প্রদর্শিত শত শত প্রকল্পের মধ্যে কেমিল বেক্টেশি এবং কোকো ক্লকনারের কাজগুলো বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। তাদের কাজের ধরন ও উপকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, মানুষের মধ্যকার অদৃশ্য বন্ধন খুঁজে বের করার এক সাধারণ আকাঙ্ক্ষা তাদের কাজকে এক সুতোয় গেঁথেছে। আর এ কারণেই অনেক সমালোচক তাদের কাজকে সমসাময়িক শিল্পের একটি আকর্ষণীয় প্রবণতা—ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং মানবিক সংবেদনশীলতার দিকে ফেরার এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
নতুন এক সুর: ঘনিষ্ঠতার শিল্প
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমসাময়িক শিল্পকলা মূলত ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরিবেশগত সংকট এবং বৈশ্বিক সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আবর্তিত হয়েছে। এই বিষয়গুলো আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গেছে। তবে বড় বড় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীগুলোতে এখন ক্রমেই ভিন্ন এক বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিল্পীরা এখন এমন সব বিষয়ের দিকে ঝুঁকছেন যা কোনো পরিসংখ্যান বা অ্যালগরিদম দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়: যেমন ভালোবাসা, যত্ন, শারীরিক অভিজ্ঞতা এবং আবেগীয় বন্ধন।
শিল্পের এই পরিবর্তন লিস্টে আর্ট ফেয়ার বাসেল ২০২৬-এ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। মেলার দৃশ্যমান চাকচিক্যের মাঝে শান্ত এবং গভীর ব্যক্তিগত কাজগুলোই দর্শকদের মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কাটছে। এগুলো বোঝার জন্য কোনো জটিল তত্ত্বের প্রয়োজন নেই এবং এগুলো নিছক নতুনত্বের চমক দিয়ে তৈরি হয়নি। বরং এদের শক্তি নিহিত রয়েছে দর্শক ও শিল্পকর্মের মধ্যে এক ধরণের আবেগীয় সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতার মধ্যে।
কেমিল বেক্টেশি: রুটি যখন সহযোগিতার রূপক
লিস্টে আর্ট ফেয়ার বাসেল ২০২৬-এর অন্যতম অংশগ্রহণকারী গ্যালারি মানুশ (Manuš)। তাদের স্টলে কেমিল বেক্টেশির কাজগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে, যেখানে স্টেইনলেস স্টিলের কাঠামোর সাথে আসল রুটির খামির ব্যবহার করা হয়েছে যা প্রদর্শনীর পুরোটা সময় জীবন্ত থাকে। এই খামির ফুলে ওঠে, বুদবুদ তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে ধাতব পৃষ্ঠের ওপর দিয়ে চুঁইয়ে নিচে পড়তে থাকে। এর ফলে দর্শকদের চোখের সামনেই শিল্পকর্মটি ক্রমাগত রূপ পরিবর্তন করতে থাকে।
এই অদ্ভুত দৃশ্যমান রূপের পেছনে একটি গভীর ব্যক্তিগত গল্প লুকিয়ে আছে। শিল্পীর বাবা পেশায় একজন রুটি প্রস্তুতকারক বা বেকার এবং তার কঠোর পরিশ্রমই ছেলেকে শিল্পচর্চার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই রুটির খামির এখানে কেবল কোনো সাধারণ উপকরণ নয়, বরং তা সমর্থন, যত্ন এবং স্বীকৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই খামির বড় হওয়ার সাথে সাথে এর রূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে জীবনের সেই সব আবেগীয় ও বস্তুগত পরিস্থিতির রূপক হয়ে ওঠে যা মানুষের বেঁচে থাকাকে সম্ভব করে তোলে।
এই শিল্পকর্মটি একটি ব্যাপক সামাজিক প্রেক্ষাপটকেও স্পর্শ করে। বেক্টেশি সেই সব মানুষের কথা মনে করিয়ে দেন যাদের প্রতিদিনের শ্রম প্রায়ই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়, যদিও তারাই সমাজের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে মূল ভূমিকা পালন করে। তবে এই কাজটিকে কেবল সামাজিক সমালোচনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এর মূল প্রতিপাদ্য হলো মানুষের একে অপরকে সাহায্য করার ক্ষমতা। তাই শিল্পীর জীবনী না জেনেও কেবল উপকরণের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া থেকেই দর্শক এর প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করতে পারেন।
কোকো ক্লকনার: আকার যেভাবে সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে
বেক্টেশি যেখানে পারস্পরিক সমর্থনের বিষয়টি অন্বেষণ করছেন, সেখানে কোকো ক্লকনার গুরুত্ব দিচ্ছেন কীভাবে বিভিন্ন আকার মানুষের সম্পর্ক এবং চারপাশের জগত সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে প্রভাবিত করে। লিস্টে আর্ট ফেয়ার বাসেল ২০২৬-এ ‘রোম্যান্স’ গ্যালারি থেকে প্রদর্শিত তার ‘আনটাইটেলড (২০২৬)’ ভাস্কর্যটি মূলত টুলবক্স এবং মাইক্রোফোনের কেস দিয়ে তৈরি একটি উঁচু কাঠামো। এর কিছু অংশ দেখে মনে হয় যেন উপড়ে ফেলা হয়েছে এবং তার ভেতরে লুকানো রয়েছে দুটি ছোট ‘কাঠের’ হৃদয়।
তবে এখানেও বাহ্যিক রূপটি আসলে বিভ্রান্তিকর। প্রথম নজরে মনে হতে পারে যে হৃদয়গুলো কাঠ দিয়ে খোদাই করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এগুলো থ্রি-ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে তৈরি এবং উপরে কাঠের ফিলার দিয়ে প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। অনুভূতির এই খেলাটিই তার শৈল্পিক অভিব্যক্তির মূল অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্লকনার অনেক দিন ধরেই পরিচিতি ও উপস্থাপনের কৌশল নিয়ে গবেষণা করছেন। বাহ্যিক রূপ কীভাবে মানুষ ও বস্তু সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে প্রভাবিত করে, কীভাবে সামাজিক ভূমিকা তৈরি হয় এবং দৃশ্যমান চিত্রগুলো কীভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলে—তা নিয়েই তার আগ্রহ। দর্শকদের কোনো নির্দিষ্ট বার্তা দেওয়ার পরিবর্তে শিল্পী এখানে এক ধরণের অনিশ্চয়তার জায়গা তৈরি করেন। আমরা যা দেখি এবং বাস্তবে যা বিদ্যমান, তার মধ্যকার পার্থক্য আমাদের বারবার ভাবিয়ে তোলে।
মূলত এই দ্বিমুখী বৈশিষ্ট্যই তার কাজকে এক বিশেষ আবেগীয় শক্তি যোগায়। তার কাজগুলো কোনো নির্দিষ্ট অর্থ চাপিয়ে দেয় না, বরং চিন্তার খোরাক জোগায় এবং প্রতিটি দর্শককে নিজস্ব উপায়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ করে দেয়।
কেন এই কাজগুলো লিস্টে আর্ট ফেয়ার বাসেল ২০২৬-এর বড় আবিষ্কার
প্রথম দেখায় কেমিল বেক্টেশি এবং কোকো ক্লকনারের কাজের পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হতে পারে: একজন কাজ করেন জীবন্ত খামিরের পরিবর্তনশীলতা নিয়ে, অন্যজন কাজ করেন শিল্পজাত বস্তু এবং উপাদানের বুনট নিয়ে। তবে সমালোচকরা একবাক্যে তাদের কাজের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন—আর তা হলো গভীর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি।
উভয় শিল্পীই স্পর্শানুভূতি এবং উপকরণের মাধ্যমে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মানবিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। বেক্টেশির কাছে ধাতব তলে বেড়ে ওঠা খামির যত্ন ও সাহায্যের রূপক, আর ক্লকনারের কৃত্রিম হৃদয়ের বুনট বাহ্যিক রূপ ও অন্তরের সত্যের মধ্যকার ব্যবধানকে ফুটিয়ে তোলে। উপকরণের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে কথা বলার এই দক্ষতাই তাদের প্রকল্পগুলোকে মেলার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উপসংহার
লিস্টে আর্ট ফেয়ার বাসেল ২০২৬ জোরালোভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, শিল্পকলা আবারো নিভৃতে কথা বলতে শিখছে—আর এই নিস্তব্ধতার মধ্যেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে শোনা যায়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, লিস্টে আর্ট ফেয়ার বাসেল ২০২৬-এর প্রধান ধারাটিকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়: সমসাময়িক শিল্পকলা ক্রমেই মানুষের কাছে ফিরে আসছে। কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি এবং বিমূর্ত প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার পর শিল্পীরা আবার তাদের কাছের বিষয়ের দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন—যেমন যত্ন, সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
কেমিল বেক্টেশি এবং কোকো ক্লকনারের কাজগুলো এই পরিবর্তনেরই সার্থক উদাহরণ:
- কঠোর ধাতব কাঠামোর ওপর ছড়িয়ে পড়া জীবন্ত রুটির খামিরের মাধ্যমে বেক্টেশি সেই সমর্থন এবং অদৃশ্য শ্রমের কথা বলেন, যা এই পৃথিবীকে টিকিয়ে রেখেছে;
- টুলবক্সের ভেতরে থাকা ‘কাঠের’ সদৃশ হৃদয়ের মাধ্যমে ক্লকনার দৃশ্যমান ও বাস্তবের ব্যবধানকে উন্মোচিত করেন, যা আমাদের উপলব্ধির কৌশল এবং সামাজিক ভূমিকা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
মেলার কিউরেটরদের মতে, শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ তৈরি করাটাই আজ শৈল্পিক অভিব্যক্তির অন্যতম মূল্যবান রূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শিল্পকর্মগুলো অনুধাবনের জন্য কোনো জটিল তাত্ত্বিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না—এগুলো সরাসরি অনুভূতি, আবেগ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দর্শকদের হৃদয়ে পৌঁছায়।
পরিশেষে বলা যায়, লিস্টে আর্ট ফেয়ার বাসেল ২০২৬ কেবল তরুণ শিল্পীদের নতুন কাজই উপস্থাপন করেনি—এটি শিল্পজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়কেও চিহ্নিত করেছে। আবেগীয় সাড়া জাগাতে এবং দর্শককে সংলাপে আমন্ত্রণ জানাতে সক্ষম এমন শিল্পকলা আমাদের তার মূল শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়: তা হলো মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা এবং মানবিক অনুভূতির ভাষায় কথা বলে প্রকৃত সহমর্মিতার মুহূর্ত তৈরি করা।



