কে-পপ ব্যান্ড বিটিএস আবারও প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাব কেবল কনসার্ট স্টেজ বা মিউজিক চার্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে, এই ‘কে-পপ সম্রাটরা’ ‘BTS THE CITY ARIRANG-LONDON’ নামে একটি বিশাল প্রকল্প শুরু করেছেন, যা সাধারণ কনসার্টের গণ্ডি পেরিয়ে ভক্তদের কোরিয়ান সংস্কৃতির গভীরে নিমজ্জিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। এর অন্যতম মূল আকর্ষণ হলো ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সাথে তাদের বিশেষ অংশীদারিত্ব। ‘কোরিয়া গ্যালারি ট্রেইল’ (Korea Gallery Trail) নামের এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কোরিয়া ফাউন্ডেশন গ্যালারিতে একটি বিশেষ আর্ট রুট তৈরি করা হয়েছে। ৬ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত চালু থাকা এই রুটে মিউজিয়ামের সংগ্রহ থেকে কোরিয়ান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন প্রদর্শন করা হচ্ছে। প্রতিটি নিদর্শনকে বিটিএসের নতুন অ্যালবাম ‘আরিরং’ (Arirang) এবং একই নামের সেই বিখ্যাত কোরিয়ান লোকসংগীতের প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে, যা কোরিয়ার জাতীয় সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
- সারংবাং (Sarangbang) — এটি মূলত একজন পণ্ডিতের কক্ষের পুনর্নির্মাণ, যা ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান বাড়ির মূল অংশ হিসেবে পড়াশোনা, আড্ডা এবং সৃজনশীল কাজের জন্য ব্যবহৃত হতো। ‘আরিরং’ অ্যালবামের প্রেক্ষাপটে সারংবাং নতুন পথচলা এবং জ্ঞান আহরণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
- মুন জার বা চন্দ্র কলস (কোরিয়ান: 백자대호, 白磁大壺) — এটি কোরিয়ান মৃৎশিল্পের অন্যতম আইকনিক নিদর্শন। ১৭শ-১৮শ শতাব্দীতে খাবার সংরক্ষণ বা ফুল সাজানোর জন্য দুটি গোলার্ধকে সংযুক্ত করে এই কলসগুলো তৈরি করা হতো, যার ফলে এগুলো পূর্ণিমার চাঁদের মতো কিছুটা অপ্রতিসম আকার পেত। মুন জার বা চন্দ্র কলস মূলত মানবিকতা, বিনয় এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক।
- ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সংগ্রহে থাকা এই স্বর্ণের দুলগুলো খ্রিস্টীয় ৫ম-৬ষ্ঠ শতাব্দীর, যা প্রাচীন শিলা (Silla) রাজবংশ (খ্রিস্টপূর্ব ৫৭ - ৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ) আমলের। এই দুলগুলো ১৫০০ বছরেরও বেশি সময় আগের কোরিয়ান স্বর্ণকারদের অসাধারণ কারুশৈলীর সাক্ষ্য দেয় এবং শিলা রাজবংশের অভিজাত সংস্কৃতিকে তুলে ধরে; এই প্রকল্পের আওতায় এগুলো সেই একই প্রতীকী তাৎপর্য বহন করছে।
- সুমাকসায়ে (কোরিয়ান: 수막새) — এটি মানুষের মুখাবয়ব খোদাই করা একটি বিশেষ ধরনের ছাদের টালি, যা ‘শিলা হাসি’ (Silla Smile) নামে পরিচিত। এই ‘শিলা হাসি’ এর বৈশিষ্ট্য হলো এর শান্ত ও লাজুক অভিব্যক্তি, যেখানে স্পষ্ট নাসিকা ও স্নিগ্ধ হাসির সাথে দুটি চোখ ফুটে উঠেছে। ২০২৫ সালে সুমাকসায়ে এপেক (APEC) ২০২৫-এর প্রতীক হয়ে ওঠে এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরে মানুষের মুখাকৃতি সংবলিত এই টালিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোরিয়ার জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই নিদর্শনটি কোরিয়ান কারিগরদের দক্ষতার ইতিহাস এবং শিল্পের সুরক্ষামূলক শক্তির প্রতি তাদের বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায়।
- চিমি (কোরিয়ান: 치미, 鴟尾) — এটি এক ধরনের আলংকারিক টালি যা ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান ভবনের ছাদের দুই প্রান্তে বসানো হতো। অপশক্তিকে ভয় দেখিয়ে দূরে রাখার জন্য এতে পশুর মুখাবয়ব চিত্রিত করা হতো। এটি স্থাপত্যের উৎকর্ষ এবং বিশ্বাসের প্রতীক।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সাথে এই সহযোগিতা মূলত ‘BTS THE CITY ARIRANG-LONDON’ প্রকল্পের একটি অংশ, যা ব্রিটিশ রাজধানীকে একটি নিমগ্ন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এই প্রকল্পটি বিটিএসের বিশ্ব সফর ‘ARIRANG’ এবং ৬-৭ জুলাই টটেনহ্যাম হটস্পার স্টেডিয়ামে আয়োজিত কনসার্টের সম্মানে গ্রহণ করা হয়েছে। এর ব্যাপকতা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো: ২০২৬ সালের ৪ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত লন্ডন শহরটি কোরিয়ান ঐতিহ্যের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়, যা আধুনিক পপ সংগীতের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। লন্ডন আই-এর লাল আলোকসজ্জা কোরিয়ান ও ব্রিটিশ সংস্কৃতির সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে, আর পুরো শহর জুড়ে ভক্তদের জন্য ছিল নানা আর্ট ইনস্টলেশন এবং অফলাইন কার্যক্রম।
বিটিএসের এই কার্যক্রম ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আগামী ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় বিশাল প্রদর্শনী ‘কোরিয়া’-র একটি আগাম আভাস হিসেবে কাজ করছে। এই প্রদর্শনীতে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কোরিয়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হবে।
বিটিএস সংগীত জগতের বাইরে পা রাখছে, এমনটা এবারই প্রথম নয়। এই ব্যান্ডটি বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বের নজর কাড়তে সক্ষম। তবে বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক জাদুঘরের সাথে এই সহযোগিতা সাংস্কৃতিক কূটনীতির একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ‘দ্য কোরিয়া টাইমস’ (The Korea Times) এর মতে, এই অংশীদারিত্ব ‘কোরিয়ান ঐতিহ্যকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত করেছে।’
বিটিএস তাদের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোরিয়ান সংস্কৃতি প্রচারের কাজে ব্যবহার করছে। এর ফলে পপ সংস্কৃতি এবং উচ্চাঙ্গ শিল্পের (High Art) মধ্যবর্তী দেয়াল ভেঙে যাচ্ছে; ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সাথে এই সংযুক্তি কে-পপকে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
‘BTS THE CITY ARIRANG-LONDON’ ইতিমধ্যেই ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিটিএসের জন্য এটি কেবল একটি মিউজিক্যাল গ্রুপ হিসেবে নয়, বরং এমন এক দূত হিসেবে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে যারা কনসার্ট ভেন্যুকে বিভিন্ন জাতির মধ্যে সংলাপের স্থানে পরিণত করতে পারে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের জন্য এটি এক নতুন এবং তরুণ আন্তর্জাতিক দর্শকগোষ্ঠীকে আকর্ষণ করার সুযোগ এনে দিয়েছে।
লন্ডনে এই প্রকল্পের সাফল্য ‘ARIRANG’ বিশ্ব সফরের অন্যান্য শহরগুলোতেও একই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের পথ প্রশস্ত করে দিতে পারে।



