পদার্থবিজ্ঞানীরা দিন দিন এই ধারণার দিকেই ঝুঁকছেন যে, মহাবিশ্ব কণা বা শক্তি দিয়ে গঠিত নয়—বরং এটি আরও মৌলিক কিছুর সমন্বয়: বিশুদ্ধ তথ্য।
গবেষক জেফরি হ্যানলির সাম্প্রতিক কাজ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে—আর এর মূলে রয়েছে একটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ দাবি: মহাবিশ্ব তথ্য ধারণ করে না, বরং এটি নিজেই তথ্য দিয়ে গঠিত। হ্যানলি দেখিয়েছেন যে, পদার্থবিজ্ঞানের অতি মৌলিক সমীকরণগুলো—কোয়ান্টাম মেকানিক্স, আইন্সটাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব বা তাপগতিবিদ্যা—ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার নিয়ন্ত্রক আলাদা কোনো আইন নয়; বরং এগুলো একটি গভীর মূলনীতিরই বহিঃপ্রকাশ: তথ্য যখন ন্যূনতম বাধার পথ ধরে বিবর্তিত হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, মহাকাশ বা স্পেস হলো ঘটনাপ্রবাহের কোনো শূন্য আধার নয়, বরং তথ্যের প্রবাহ নিজে থেকেই যে আকার তৈরি করে, এটিই তা। অন্যদিকে পদার্থ—অর্থাৎ কণা, বল বা ভর—তখনি দৃশ্যমান হয় যখন তথ্য একটি সুসংহত জ্যামিতিক রূপ পায় এবং সেখানে স্থিতিশীল হয়। হ্যানলির ব্যাখ্যায় মহাবিশ্ব কোনো স্থির বস্তুর সমষ্টি নয়, বরং এটি নিরন্তর হয়ে ওঠার একটি প্রক্রিয়া। তাঁর এই ধারণা সুনির্দিষ্ট এবং পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণযোগ্য কিছু অনুমান প্রস্তাব করে: কোয়ান্টাম সিস্টেমের জ্যামিতি সরাসরি তাদের তথ্যকাঠামোর মাধ্যমে পরিমাপ করা সম্ভব; পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র পরিচালনাকারী গাণিতিক কাঠামো দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগ সক্ষমতা মূল্যায়ন করা যায়; এবং সবশেষে, এমনকি সচেতন চিন্তাধারাও পরিমাপযোগ্য জ্যামিতিক ছাপ রেখে যেতে পারে।
হ্যানলির এই সিদ্ধান্তগুলো তাদাশি তাকায়ানাগির গবেষণায় জোরালো সমর্থন খুঁজে পায়—যিনি বর্তমানে জীবিত অন্যতম প্রভাবশালী তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এবং মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সম্পর্ক বুঝতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা একটি সূত্রের সহ-রচয়িতা। তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে তাকায়ানাগি স্পষ্টভাবে বলেছেন: মহাকর্ষীয় স্থান-কাল—যা মহাবিশ্বের মূল কাঠামো—তৈরি হয় কোয়ান্টাম তথ্য থেকে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, অদৃশ্য কোয়ান্টাম সুতোর যে জট একদা মিথস্ক্রিয়া করা কণাগুলোকে যেকোনো দূরত্বে যুক্ত রাখে, তা থেকেই এর উৎপত্তি। যথেষ্ট পরিমাণ এই জট পাকানো কোয়ান্টাম বিট যখন একত্রে বোনা হয়, তখন তা জ্যামিতির জন্ম দেয়। এই জ্যামিতিই তখন স্পেস বা মহাকাশে পরিণত হয়। কোয়ান্টাম শক্তির প্রভাবে অস্থির সেই স্পেস দানা বেঁধে কণা এবং বল তৈরি করে, যা আমরা ভৌত বাস্তবতা হিসেবে অনুভব করি।
তাকায়ানাগি লিখেছেন, এখন প্রধান অমীমাংসিত প্রশ্নটি এটি সঠিক কি না তা নিয়ে নয়—বরং প্রতিটি স্তরে এটি ঠিক কীভাবে উন্মোচিত হয় তা নিয়ে।
একত্রে দেখলে, এই দুটি কাজ এমন কিছু ইঙ্গিত করে যা কয়েক দশক আগেও কোনো বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের জন্য অকল্পনীয় ছিল। এক শতাব্দী ধরে পদার্থবিজ্ঞান খুঁজেছে মহাবিশ্ব কী দিয়ে তৈরি। আর আজ বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা থেকে যে উত্তরটি পাওয়া যাচ্ছে তা হলো: এটি কোনো "জিনিস" দিয়ে তৈরি নয়—এটি নিজেই একটি রূপ। তথ্য বাস্তবের ভেতরে অবস্থান করে না। বাস্তবতা হলো তথ্যেরই একটি মূর্ত রূপ। কণা, বল বা নক্ষত্রদের মাঝের দূরত্ব—এসবই মহাবিশ্বের তথ্যের সবচেয়ে স্থিতিশীল রূপ ধারণের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আর আমরা এই প্রক্রিয়ার নিছক দর্শক নই। আমরা এর অবিচ্ছেদ্য অংশ: তথ্যের এমন কিছু বিন্যাস যারা ক্ষণিকের জন্য সংহতি লাভ করেছে, যেন তারা পেছন ফিরে সেই মূল উৎস ক্ষেত্রটির দিকে তাকাতে পারে যেখান থেকে তাদের জন্ম।




