বিবর্তন অনেক সময় একজন ঘোরগ্রস্ত ডিজাইনারের মতো আচরণ করে, যেখানে বারবার একই নকশায় ফিরে আসার প্রবণতা দেখা যায়। জীববিজ্ঞানীদের কাছে এর একটি বিশেষ পরিভাষা আছে — 'কার্সিনাইজেশন' (Carcinization)। এটি এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের জলজ প্রাণী বা ক্রাস্টেসিয়ানরা কাঁকড়ার রূপ ধারণ করে। গত ২০ কোটি বছরে প্রকৃতি অন্তত পাঁচবার আলাদাভাবে কাঁকড়া 'উদ্ভাবন' করেছে। কেন এই দৈহিক গঠনটি টিকে থাকার জন্য এত কার্যকর?
একটি ধ্রুপদী কাঁকড়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর আঁটসাঁট বা জমাটবদ্ধ গঠন। লম্বা লেজবিশিষ্ট পূর্বপুরুষদের (যেমন গলদা চিংড়ি) তুলনায় কাঁকড়া তার পেটের অংশটি বক্ষদেশের নিচে গুটিয়ে রেখেছে। এটি তাদের শিকারিদের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং পাথরের অতি সরু খাঁজেও আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। শরীরের এই আমূল পরিবর্তনের কারণেই তাদের সেই বিখ্যাত পাশাপাশি বা আড়ষ্ট হাঁটার ধরনটি তৈরি হয়েছে।
এর পেছনে কাজ করে নিছক বলবিদ্যা বা মেকানিক্স। যখন শরীরের খোলস দৈর্ঘ্যের তুলনায় প্রস্থে বেশি বেড়ে যায়, তখন পাগুলো স্বাভাবিকভাবেই শরীরের দুপাশে সরে আসে। সামনের দিকে হাঁটতে হলে পায়ের সন্ধিগুলোর যে অবিশ্বাস্য ঘূর্ণন ক্ষমতার প্রয়োজন হতো, তা পুরো গঠনকেই দুর্বল করে দিত। পাশাপাশি হাঁটার ফলে কাঁকড়া তার পায়ের সন্ধিগুলোর সরল অথচ শক্তিশালী লিভারের মতো নড়াচড়া ব্যবহার করে দ্রুত গতিতে চলতে পারে এবং নিজের পায়ে পা আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেও মুক্ত থাকে।
এটি কৌশলী নড়াচড়ার ক্ষেত্রে অভাবনীয় সুবিধা প্রদান করে। কোনো শিকারি যখন ঘুরে দাঁড়াতে সময় ব্যয় করে, কাঁকড়া তখন তার শরীরের অবস্থান পরিবর্তন না করেই স্রেফ গতির দিক বদলে ফেলে। মজার বিষয় হলো, বিবর্তন এখানেই থেমে থাকেনি; 'ডিকার্সিনাইজেশন' নামক একটি প্রক্রিয়াও প্রকৃতিতে বিদ্যমান, যেখানে কিছু প্রজাতি আবার সময়ের সাথে লম্বাটে আকার ধারণ করতে শুরু করে।
কিন্তু আমাদের কেন এসব জানা প্রয়োজন? কাঁকড়ার বায়োমেকানিক্স বা জৈব-বলবিদ্যা নিয়ে গবেষণা বর্তমানে দুর্গম এলাকা এবং সমুদ্রের তলদেশে চলাচলের উপযোগী 'ওয়াকিং রোবট' তৈরিতে বিশেষ সহায়তা করছে। তাদের হাঁটার ধরন অনুকরণ করে এমন সব যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে যা পানির তীব্র স্রোতেও স্থির থাকতে পারে এবং পাথর বা ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়েও অনায়াসে চলাচল করতে পারে, যেখানে চাকাওয়ালা প্রযুক্তি পুরোপুরি ব্যর্থ।
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আমাদের নিজেদের শরীরের গঠন আমাদের চলাচলের স্বাধীনতাকে কতটা সীমাবদ্ধ করে রাখে, ঠিক যেভাবে একটি শক্ত খোলস কাঁকড়ার চলার পথ নির্ধারণ করে দেয়?
ভবিষ্যতে বিবর্তনের এই 'অচল পথ' এবং 'সাফল্য' সম্পর্কে গভীর জ্ঞান আমাদের এমন সব কৃত্রিম ব্যবস্থা বা সিস্টেম নকশা করতে সাহায্য করবে, যা কোটি কোটি বছর ধরে বিবর্তিত হওয়া প্রাকৃতিক প্রোটোটাইপের মতোই পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হবে।




